| রহমত আরিফ, ঠাকুরগাঁও সংবাদদাতা
ব্যস্ত সড়কের ওপর পড়ে ছিল একটি নিথর দেহ। চারপাশ দিয়ে ছুটে যাচ্ছিল ট্রাক, মোটরসাইকেল, অটোরিকশা। মানুষের জীবন চলছিল নিজের স্বাভাবিক গতিতে। কিন্তু থেমে গিয়েছিল একদল অবলা প্রাণী। রাস্তার ডিভাইডারের ওপর মৃত সঙ্গীটিকে ঘিরে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় দাঁড়িয়ে ছিল পুরো ভেড়ার পাল। কেউ সামনে এগোয়নি, কেউ সরে যায়নি। নিঃশব্দে তারা তাকিয়ে ছিল পড়ে থাকা সঙ্গীটির দিকে। যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না যার সঙ্গে কিছুক্ষণ আগেও পাশাপাশি হেঁটেছে, সে আর কোনোদিন উঠবে না।
সম্প্রতি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার মুন্সীরহাট এলাকায় দেখা মিলেছে এমনই এক হৃদয়স্পর্শী ও আবেগঘন দৃশ্যের, যা মুহূর্তেই নাড়িয়ে দিয়েছে পথচারী, স্থানীয় বাসিন্দা এমনকি সড়কে চলাচলকারী মানুষদেরও।
স্থানীয়রা জানান, প্রতিদিনের মতো খামারি মো. ফরিদের ভেড়ার পাল একসঙ্গে মাঠে যাওয়ার জন্য বের হয়েছিল। মুন্সীরহাট এলাকায় রাস্তা পার হওয়ার সময় হঠাৎ একটি দ্রুতগামী যান একটি ভেড়াকে ধাক্কা দেয়। মুহূর্তেই লুটিয়ে পড়ে প্রাণীটি।
সাধারণত এমন ঘটনায় প্রাণীরা আতঙ্কে ছুটে পালিয়ে যায়। কিন্তু এবার ঘটল উল্টো ঘটনা। মৃত ভেড়াটিকে ঘিরে ডিভাইডারে জড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে বাকি ভেড়াগুলো। কেউ রাস্তা ছাড়েনি। কেউ দূরে সরে যায়নি। যেন নিথর হয়ে পড়ে থাকা সঙ্গীটিকে একা রেখে যেতে তাদের মন সায় দিচ্ছিল না।
ঘটনার সময় রাস্তার পাশে ছিলেন দোকানি মো. মোস্তাক আলী। বলেন, গাড়ির ধাক্কায় ভেড়াটা মারা যাওয়ার পর আমি ভাবছিলাম বাকি ভেড়াগুলো ভয় পেয়ে পালিয়ে যাবে। কিন্তু ওরা একটুও সরেনি। রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে শুধু মৃত ভেড়াটার দিকেই তাকিয়ে ছিল। দৃশ্যটা দেখে বুকটা কেঁপে উঠেছিল।
পথচারী সুজন মিয়া বলেন, আমরা কয়েকজন মিলে ওদের সরানোর চেষ্টা করেছি। শব্দ করেছি, লাঠি উঁচিয়ে ভয়ও দেখিয়েছি। কিন্তু ওরা যায়নি। মনে হচ্ছিল, ওরা বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে তাদের সঙ্গী আর কোনোদিন উঠবে না। প্রায় দেড় ঘণ্টা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল ভেড়ার পালটি। এ সময় সড়কে যান চলাচলেও কিছুটা বিঘ্ন ঘটে। কিন্তু কেউ তাদের ওপর বিরক্ত হয়নি। বরং অনেকেই দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখেছেন।
খবর পেয়ে পরে ঘটনাস্থলে আসেন ভেড়ার মালিক মো. ফরিদ। তিনি মৃত ভেড়াটিকে সরিয়ে নেওয়ার পর ধীরে ধীরে রাস্তা ছাড়ে বাকি ভেড়াগুলো।
ফরিদ বলেন, মানুষ মনে করে এরা অবলা প্রাণী, এদের বুদ্ধি বা আবেগ নেই। কিন্তু এদের ভেতরের টান মানুষের চেয়ে কোনো অংশে কম না। আমি ৩০ বছর ধরে ভেড়া পালন করছি। এতদিনের অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি, ভেড়াদের একটা স্বভাব আছে, এরা সবসময় দলবদ্ধ হয়ে চলে। দলের কেউ বিপদে পড়লে বা হারিয়ে গেলে এরা সহজে তাকে ছেড়ে যায় না।
তিনি আরও বলেন, আজকে যেখানে দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেখানে ওরা ওদের সঙ্গীর মৃত্যুটা মেনে নিতে পারছিল না। ওরা ভাবছিল, হয়তো ও একটু পরেই উঠে দাঁড়াবে। আমি এসে যখন মৃত ভেড়াটাকে সরিয়ে নিলাম, তখন ওরা বুঝতে পারল যে ওদের সঙ্গী হয়তো আমার হেফাজতে আছে। এরপরই ওরা আমার সঙ্গে রাস্তা থেকে সরে আসে।
এই বিষয়ে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের প্রাণীবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক প্রাণীবিদ ডালিম কুমার রয় জানান, পশু-পাখিদের এমন আচরণ মানুষের কাছে অদ্ভুত মনে হলেও এটি তাদের এক ধরনের আদিম ও শক্তিশালী সামাজিক বন্ধন। হাতি, তিমি, শিম্পাঞ্জি কিংবা কুকুরের মতো গৃহপালিত ও স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে শোক প্রকাশের তীব্র অনুভূতি থাকে।
তিনি আরও বলেন, দলবদ্ধ প্রাণীরা যখন তাদের কোনো সঙ্গীকে হঠাৎ হারিয়ে ফেলে, তখন তারা এক ধরনের মানসিক ধাক্কা বা ‘গ্রিফ’ এর মধ্য দিয়ে যায়। ভেড়াদের ক্ষেত্রে এই দলবদ্ধতা বা হার্ড মেন্টালিটি অত্যন্ত তীব্র। তারা বিপদের মুহূর্তে বিচ্ছিন্ন না হয়ে আরো বেশি একত্রিত হয়, মুন্সীর হাটের এই ঘটনাটি যার স্পষ্ট উদাহরণ।