জুলাই সনদের অঙ্গীকার উপেক্ষা করে সরকার পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করেছে। একই সঙ্গে সচিবালয়ে কর্মরত ১৫ কর্মকর্তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে ফেরত নেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার রাষ্ট্রপতির আদেশে এ সংক্রান্ত পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করে আইন ও বিচার বিভাগ।
ফেরত নেওয়া কর্মকর্তাদের আইন মন্ত্রণালয়ে যোগদানের তারিখ দেখানো হয়েছে গত ১০ এপ্রিল। এর একদিন আগে জাতীয় সংসদে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল’ পাসের মাধ্যমে অধ্যাদেশটি বাতিল করা হয়।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে জুডিশিয়াল সার্ভিসের ১৫ সদস্যকে পরবর্তী পদায়ন না হওয়া পর্যন্ত আইন ও বিচার বিভাগে সংযুক্ত করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার পৃথক সচিবালয় গঠনের উদ্দেশ্যে অধ্যাদেশ জারি করলেও পরবর্তীতে বিএনপি সরকার সেটিকে আইনে রূপ দেয়নি। ফলে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক রাখার নির্দেশনা রয়েছে। তবে স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।
১৯৯৪ সালে অধস্তন আদালতের বিচারকদের বেতন কাঠামো নিয়ে অসন্তোষের জেরে বিচারপতি মাসদার হোসেনসহ ৪৪১ জন বিচারকের পক্ষে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর আপিল বিভাগ ঐতিহাসিক রায়ে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক রাখা, জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত করা এবং নিম্ন আদালতের বাজেটে নির্বাহী হস্তক্ষেপ বন্ধের নির্দেশ দেয়।
এর প্রায় আট বছর পর, ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক ঘোষণা করে। তবে বাস্তবে প্রশাসনিক স্বাধীনতা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি বলে সমালোচনা ছিল।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের ২৫তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে সৈয়দ রেফাত আহমেদ মাসদার হোসেন মামলার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, আইন মন্ত্রণালয় ও সুপ্রিম কোর্টের ‘দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা’ বিলোপ এবং পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা ছাড়া বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা সম্ভব নয়।
এর ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৩০ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে। পরে অতিরিক্ত দায়িত্বে রেজিস্ট্রার জেনারেল হাবিবুর রহমান সিদ্দিকীকে সচিব করা হয় এবং সচিবালয়ের কাঠামো নির্ধারণে কমিটি গঠন করা হয়। ১০ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক ভবনে সচিবালয়ের উদ্বোধন করা হয়।
তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অধ্যাদেশটি আইনে রূপ না দিয়ে গত ৯ এপ্রিল সংসদে বিল পাসের মাধ্যমে সচিবালয় বিলুপ্ত করে। এর ফলে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।