| রহমত আরিফ, ঠাকুরগাঁও সংবাদদাতা
এক সময় গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসার সবচেয়ে বড় ভরসা ছিল এসব কমিউনিটি ক্লিনিক। সামান্য জ্বর-সর্দি থেকে শুরু করে ব্যথা, গ্যাস্ট্রিক, ডায়রিয়াসহ নানা রোগের প্রয়োজনীয় ওষুধ মিলত বিনামূল্যেই।
কিন্তু এখন এসব ক্লিনিকের বেশিরভাগ ওষুধের তাক ফাকা। গর্ভবতী নারীদের জন্য সীমিত পরিমাণ আয়রন ও অ্যান্টাসিড ট্যাবলেট ছাড়া প্রায় কোনো ওষুধই নেই।
ফলে প্রতিদিন চিকিৎসাসেবা নিতে এসে হতাশ হয়ে ফিরছেন শত শত রোগী। দীর্ঘ ছয় মাস ধরে চলা এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের মানুষ, যাদের অনেকের পক্ষেই বাইরে থেকে ওষুধ কিনে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পীরগঞ্জ উপজেলায় প্রতি ছয় হাজার মানুষের জন্য একটি করে মোট ২৮টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। একসময় এসব ক্লিনিকে ২৭ ধরনের ওষুধ সরবরাহ করা হলেও পরে তা কমিয়ে ২২ প্রকারে আনা হয়। সর্বশেষ গত বছরের আগস্ট মাসে ওষুধ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। পরে সীমিত পরিমাণে কিছু ওষুধ এলেও তা নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। চলতি বছরে নতুন করে পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ না আসায় সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভারপ্রাপ্ত স্টোরকিপার ওমর ফারুক বলেন, আগের মতো এখন আর ওষুধ আসে না। যা আসে তা সব কমিউনিটি ক্লিনিকে ভাগ করে দেওয়া হয়। সীমিত সেই ওষুধও কয়েক মাসের মধ্যে শেষ হয়ে যায়। এরপর নতুন করে সরবরাহ না আসায় সংকট তৈরি হয়েছে।
বীরহলি কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধ নিতে আসা এক নারী রোগী বলেন, “আগে এখানে ঠান্ডা, জ্বর, কাশি, ব্যথা, গ্যাস্ট্রিক ও আমাশয়সহ বিভিন্ন রোগের ওষুধ বিনামূল্যে পাওয়া যেত। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে কোনো ওষুধ নেই। এখন হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে। আমরা গরিব মানুষ, বাইরে থেকে বেশি টাকা দিয়ে ওষুধ কেনা সম্ভব না।”
একই অভিযোগ করেন বৃদ্ধিগাঁও কমিউনিটি ক্লিনিকের সেবাগ্রহীতা নুরজাহান ও আফরোজা। তারা বলেন, “গরিব মানুষের জন্য এই ক্লিনিকগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ওষুধ না থাকায় আমাদের কষ্ট বেড়েছে। শহরে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়া সব সময় সম্ভব হয় না। বাড়ির কাছে ক্লিনিক থাকায় আগে অনেক সুবিধা হতো।”
ভাকুরা কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধ নিতে আসা মনিরা খাতুন বলেন, “আমরা গরিব মানুষ, বাইরে থেকে টাকা দিয়ে ওষুধ কেনা কঠিন। আগে এখানে বিনামূল্যে ওষুধ পেতাম, এখন শুধু পরামর্শ নিয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে। দ্রুত ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থা করা দরকার।”
চন্দরিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মী বেবী নাজনীন বলেন, “প্রায় পাঁচ মাস ধরে কোনো ওষুধ পাচ্ছি না। প্রতিদিন জ্বর, সর্দি, কাশি, ডায়রিয়া ও দুর্বলতাসহ নানা সমস্যার রোগী আসেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় ওষুধ না থাকায় তাদের ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে।”
এ বিষয়ে পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ডা. আবুল বাসার মো. সাইদুজ্জামান বলেন, “কয়েক মাস ধরেই ওষুধের সংকট চলছে। সম্প্রতি কিছু ওষুধ এসেছে, সেগুলো কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে বিতরণ করা হবে। তবে নতুন অর্থবছরের বরাদ্দ না এলে পুরোপুরি সংকট কাটবে না।”
ঠাকুরগাঁওয়ের সিভিল সার্জন ডা. আনিসুর রহমান বলেন, “কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে ওষুধ সংকট রয়েছে। বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে। আশা করছি দ্রুতই ওষুধ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।”