মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১২:১৮ পূর্বাহ্ন

অন্যায়ের মাঠে অপরাজিত ইরান, বীরত্ব নিয়েই বিদায়

  • সময়: সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬, ৯.৫০ এএম
  • ২৫ জন

তারা বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে। কিন্তু পরাজিত হয়ে নয়। তিন ম্যাচ খেলেছে, একটিতেও হারেনি। মাঠে প্রতিপক্ষ তাদের হারাতে পারেনি। অথচ বিদায় নিতে হয়েছে। কারণ, প্রতিপক্ষ ছিল শুধু মাঠের ১১ ফুটবলার নন; প্রতিপক্ষ ছিল ভিসা-রাজনীতি, প্রশাসনিক বৈষম্য, অমানবিক ভ্রমণসূচি, বিতর্কিত সিদ্ধান্ত আর ফিফার নীরবতা।

এ বিশ্বকাপে ইরানের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না কোনো ফুটবল দল। মূল প্রতিপক্ষ ছিল এমনসব বৈরী পরিবেশ। সে পরিবেশের বিপরীতে দাঁড়িয়েই মাথা উঁচু করে লড়েছে কোচ আমির ঘালেনোইয়ের দল। শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থেকেই বিদায় নিয়েছে তারা। কিন্তু বিদায়বেলায় ক্ষোভের ভাষা নয়, ড্রেসিংরুমে রেখে গেছে শান্তির বার্তা। ফুটবল ইতিহাসে এমন অধ্যায়, এমন বিজয়ের স্ক্রিপ্ট খুব বেশি লেখা হয় না।

বিশ্বকাপের বল গড়ানোর আগেই শুরু হয়েছিল ইরানের পরীক্ষা। যুক্তরাষ্ট্রের চাপে শেষ মুহূর্তে বদলে যায় তাদের নির্ধারিত প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। দলের কোচিং ও প্রশাসনিক কাজের সঙ্গে জড়িত একাধিক কর্মকর্তা মার্কিন ভিসা পাননি। লজিস্টিক সহায়তার বড় অংশ ছাড়াই টুর্নামেন্ট খেলতে হয়েছে দলটিকে।

এরপর তাদের ওপর নামল চলাচলের বিধিনিষেধও। প্রথম দুই ম্যাচে প্রায় কারফিউসদৃশ নিয়মের মধ্যে থাকতে হয়েছে ইরানকে। দ্বিতীয় ম্যাচের আগে মাত্র ১৬ ঘণ্টা হাতে নিয়ে তারা পৌঁছায় ম্যাচ ভেন্যুতে। আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে কোনো দলের প্রস্তুতির জন্য এমন পরিস্থিতি কল্পনাও করা কঠিন। তবুও ফিফার পক্ষ থেকে শোনা যায়নি কোনো দৃঢ় প্রতিবাদ!

ম্যাচ শেষে কোচ আমির ঘালেনোই বলেছিলেন, ‘আমরা রাজনীতি নিয়ে কথা বলছি না। আমরা শুধু বলছি, আমাদের সঙ্গে যা হয়েছে, ভবিষ্যতে যেন আর কোনো দলের সঙ্গে তা না হয়।’ মিডফিল্ডার সাইদ এজাতোল্লাহিও প্রকাশ্যে বলেন, মাত্র ১৬ ঘণ্টা আগে ভেন্যুতে পৌঁছে বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলা কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়।

২০১৭ সালে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বলেছিলেন, ‘বিশ্বকাপে ওঠা প্রতিটি দলকে স্বাগতিক দেশে প্রবেশের সুযোগ দিতে হবে। নইলে বিশ্বকাপই হবে না।’ কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে এসে সে অবস্থান আর দেখা গেল না। এবার তার বক্তব্য, ‘আমরা বিশ্বের রাজা নই। আমরা একটি ক্রীড়া সংস্থা।’

এ অবস্থান অনেকের কাছেই ফিফার নৈতিক পরাজয়। কারণ, বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসরে সব দলের জন্য সমান পরিবেশ নিশ্চিত করাই তো সংস্থাটির মৌলিক দায়িত্ব।

প্রশাসনিক বৈষম্য মাঠেও যেন পিছু ছাড়েনি ইরানের। শেষ দুই ম্যাচে ভিএআরের মাধ্যমে তাদের দুটি গোল বাতিল হয়। বিশেষ করে মিসরের বিপক্ষে যোগ করা সময়ে শোজা খলিলজাদেহর গোলটি বাতিল হওয়ার সিদ্ধান্ত আজও বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে। গোলটি বহাল থাকলে ইরান ম্যাচ জিতত ২-১ ব্যবধানে, বদলে যেতে পারত পুরো গ্রুপের হিসাব।

শেষ পর্যন্ত তিন ম্যাচে তিন ড্র। কোনো হারও নয়। অথচ নকআউটে ওঠা হলো না। অপরাজিত থেকেও বিদায়-বিশ্বকাপে এমন ঘটনা বিরল। আর ইরানের ক্ষেত্রে সেটি আরো বেদনাদায়ক; কারণ তাদের লড়াই ছিল দুই ফ্রন্টে মাঠে ও মাঠের বাইরে।

ইরানের ভাগ্য নির্ধারণ হয়েছিল অস্ট্রিয়া ও আলজেরিয়ার ম্যাচে। এ ম্যাচের যে কোনো একটি দল জিতলেই নকআউটে উঠত ইরান। কিন্তু ম্যাচ শেষ হয় ৩-৩ গোলে। তাও আবার শেষ মুহূর্তের গোলে নাটকীয় সমতা। স্বাভাবিকভাবেই অনেক ইরানি সমর্থকের মনে ফিরে আসে ১৯৮২ সালের ‘গিজনের কলঙ্ক’-যেখানে পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার সমঝোতার ফল আলজেরিয়াকে বিদায় করেছিল।

কিন্তু এবার সে অভিযোগ টেকে না। কানসাস সিটির ম্যাচটি ছিল রুদ্ধশ্বাসের। ছয় গোল, নাটকীয় প্রত্যাবর্তন, ৯৩ মিনিটে আলজেরিয়ার এগিয়ে যাওয়া, ৯৬ মিনিটে অস্ট্রিয়ার সমতা—এমন ম্যাচকে পাতানো বা সাজানো বলার সুযোগ নেই।

তবুও ইরানের কষ্ট কমে না। কারণ তারা জানে, ভাগ্যের আগে তাদের লড়তে হয়েছে বৈষম্যের বিরুদ্ধেও।

বিশ্বকাপ প্রায় শেষ। কিন্তু ইরানের শেষ দৃশ্যটি ছিল অন্যরকম। দলের অধিনায়ক মেহদি তারেমি বলেছিলেন, ‘ফুটবলকে রাজনীতির বাইরে রাখা উচিত।’ ড্রেসিংরুমে রেখে যাওয়া তাদের বিদায়বার্তাও ছিল শান্তি, সহাবস্থান আর মানবিকতার পক্ষে।

অসংখ্য বাধা, দীর্ঘ ভ্রমণ, ভিসা সংকট, প্রশাসনিক জটিলতা, বাতিল গোল—সবকিছুর পরও তারা ক্ষোভকে ঘৃণায় পরিণত করেনি। দলের কোচ ঘালেনোইয়ের শেষ কথাটিও তাই ছিল শান্তিরই আহ্বান—‘আমি আশা করি বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। আর ভবিষ্যতে কোনো দলের সঙ্গে এমন আচরণ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে না।’

এ বিশ্বকাপে হয়তো ইরান ট্রফি জেতেনি। নকআউটেও ওঠেনি। কিন্তু তারা রেখে গেছে আরো মূল্যবান কিছু-অন্যায়ের মুখেও মাথানত না করার সাহস। ফুটবল কখনো কখনো স্কোরলাইনের চেয়েও বড় গল্প বলে।

২০২৬ বিশ্বকাপে ইরানের গল্পটি ঠিক তেমনই। একটি অপরাজিত দলের, যারা বিদায় নিয়েছে বীরের বেশে আর রেখে গেছে একটি কঠিন প্রশ্ন, আর তা হলো বিশ্বকাপ কি সত্যিই সবার জন্য সমান? নাকি এ বিশ্বকাপ বৈষম্যের বিষে বিষাক্ত? 

আপনার সামাজিক মাধ্যমে খবরগুলো শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও খবর পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2026 © All rights reserved by BUD News 24