যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের দ্বিতীয় মেয়াদটা বেশ দ্রুতই শুরু করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুধু মার্কিনিরাই নয়, পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্রেও যুক্তরাষ্ট্রের সরকার পরিবর্তন নিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল লক্ষণীয়।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার আগেই ট্রাম্প চীনের ওপর শুল্ক আরোপের এবং ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়াকে সতর্ক করে হুমকি দিয়েছিলেন। ট্রাম্পের অভিষেকের এক দিন পরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রধানমন্ত্রী শি জিনপিং ভার্চুয়াল বৈঠক করেন।
রাশিয়া ও চীনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে বদ্ধপরিকর পুতিন ও শি ট্রাম্পের আমেরিকার সঙ্গে তাদের পররাষ্ট্র সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেন। কৌশলগত সমন্বয়, জোরালো পারস্পরিক সহযোগিতা ও বৈধ স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিই ছিল তাদের আলোচনাজুড়ে। উল্লেখ্য, পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থনৈতিক অবরোধের মুখ পড়ার পর রাশিয়া চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। মাত্র দুবছরে ২০২৩ সালে রুশ-চীন বাণিজ্য উন্নীত হয় ২৪০ বিলিয়ন ডলারে। পুতিন ও শি দুজনই ট্রাম্পকে তাদের দেশের সঙ্গে পারস্পরিক লাভজনক ও সম্মানজনক সম্পর্ক বজায় রাখার আহ্বান জানান।
এদিকে ট্রাম্পের অভিষেকের দুদিন পর দুই বন্ধু দেশের নেতা জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শুলৎজ ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রো সরাসরি বৈঠকে মুখোমুখি হন। একটি শক্তিশালী ইউরোপ গড়ে তুলতে তারা একত্রে কাজ করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। ট্রাম্প ইউরোপের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবেন—এই উদ্বেগ প্রকাশ করেই শুলৎজ বলেন, এতে ইউরোপের ভয়ের কোনো কারণ নেই, বরং ক্রমপরিবর্তনশীল বিশ্বে তারা আরও গঠনমূলক ও আত্মবিশ্বাসী অংশীদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। নিজেদের দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের আশঙ্কা করে ইউরোপীয় নেতারা রাজনৈতিক স্বাধীনতার ওপর জোর দিচ্ছেন।
ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে পাশ্চাত্যের বিশেষজ্ঞরা এরই মধ্যে সরব হয়ে উঠেছেন। তাদের একটি অংশ যেখানে ট্রাম্প-প্রশাসনকে তুলোধুনোতে ব্যস্ত, তখন কেউ কেউ আবার ট্রাম্পের নীতি ব্যতিক্রম বলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করতে সচেষ্ট। প্রথম অংশটির দাবি, পশ্চিমা মূল্যবোধই সর্বজনীন এবং পশ্চিমা নেতৃত্বই বিশ্বব্যবস্থা নির্ধারণ করবে। তাদের মতে, ট্রাম্পের নীতি পশ্চিমা রাজনৈতিক বা তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে পড়ে না। ফরেন অ্যাফেয়ার্স সাময়িকীতে একটি নিবন্ধে ‘ট্রাম্পের আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি বাস্তবসম্মত নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ট্রাম্পের কৌশলের বিশ্লেষণ
স্পষ্টতই ট্রাম্প অনুসৃত রাজনৈতিক কৌশল আক্রমণাত্মক হতে চলেছে। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে মার্কিন স্বার্থের বিষয়টি প্রতিফলিত হলেও ট্রাম্পের একচ্ছত্র ও হস্তক্ষেপবাদী পররাষ্ট্র নীতিটি কেবল বাস্তবতাবিবর্জিত আক্রমণাত্মক চরিত্রেরই বহিঃপ্রকাশ। তার নীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা গেলেও তার বাস্তবতা নিয়ে নয়। স্বার্থ আর শক্তি—এ দুই ধারণাই হচ্ছে ট্রাম্পের রাষ্ট্র পরিচালনার মূল উপজীব্য। মার্কিন স্বার্থই তার কাছে মুখ্য এবং যে ভাষায় কথা বলতে তিনি পারদর্শী, তা হলো ‘ক্ষমতা’। অধিকতর রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ, বৈশ্বিক, মহাদেশীয় ও আঞ্চলিক সাধারণ স্বার্থ কম বিবেচনা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, কম মুক্ত-বাণিজ্য এবং আরও বেশি ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষাই হলো ট্রাম্প প্রশাসনের মূল বৈশিষ্ট্য। তার প্রশাসন মূলত ক্ষমতার রাজনীতিরই প্রতিনিধিত্বকারী। ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক নীতি থেকে তার শত্রু-মিত্র কেউই নিরাপদ নয়। এর কারণ দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসতে না আসতেই শত্রু-মিত্র সবাইকে তার হুমকি প্রদান। জোট, বিশ্বায়ন কিংবা কোনো সংস্থায় তিনি বিশ্বাসী নন। জলবায়ু চুক্তি এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে বেরিয়ে গিয়ে সম্প্রতি তিনি এই বার্তাটি আরো জোরালোভাবেই দিলেন।
যে যার মতো
শত্রু বা মিত্ররা কী ভাবছে, তাতে ট্রাম্পের বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। আর এ কারণেই ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নিয়ে চিন্তিত। এরই মধ্যে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোকে প্রতিরক্ষা বাজেট ন্যূনতম পাঁচ শতাংশে উন্নীত করার আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প। উল্লেখ্য, নিজের প্রথম মেয়াদেও তিনি ন্যাটো সদস্যদের প্রতিরক্ষা খাতে জিডিপির দুই শতাংশ বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছিলেন। এবার ইউরোপীয়দের এই ব্যয় আরও বাড়ানোর পরামর্শ দিলেন। তার এই একতরফা নীতি ইউরোপীয় দেশগুলোকে বৈশ্বিক গুরুত্ব হারানোর ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। অনেক ইউরোপীয় রাজনীতিকই তার এই নীতির সম্ভাব্য অকার্যকারিতা চিন্তা করে এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে শুরু করেছেন।
আক্রমণাত্মক বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ট্রাম্প সব বিশ্বনেতাকেই শাসাচ্ছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অন্য দেশগুলোও নিজেদের পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আনছে।
ট্রাম্পের নীতির মোকাবিলায় কৌশলগত পুনর্নির্ধারণে কলম্বিয়াই একমাত্র দেশ নয়, প্রতিবেশী কানাডা ও মেক্সিকোও তার সম্প্রসারণবাদী নীতিতে উদ্বিগ্ন। পানামা খাল ও গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীভূত করতে ট্রাম্পের দাবি এরই মধ্যে পানামা ও ডেনমার্কের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্পের নীতির সঠিক অনুসরণ না করলে ট্রাম্প অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনেও পিছপা হবেন না বলে যে হুমকি দিয়েছেন, তাতে বহু পুরোনো মার্কিন মিত্রদের অনেকেই এখন নিজেদের সার্বভৌমত্ব (আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি) নিয়ে উদ্বিগ্ন।
ট্রাম্পের একতরফা নীতির প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে অনেক দেশই নতুন মার্কিন সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই আরব দেশগুলোও। সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ৬০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছেন। তাতেও খুশি নন ট্রাম্প। ট্রাম্প সালমানকে এই বিনিয়োগের পরিমাণ এক হাজার বিলিয়ন করার এবং তেলের মূল্য কমানোর আহ্বান জানান।