গাজায় প্রায় ১৫ মাস ধরে বর্বর আগ্রাসন চালাচ্ছে ইসরাইল। এই যুদ্ধ বন্ধে দীর্ঘদিন ধরে চলছে আলোচনা ও মধ্যস্থতা। আমেরিকা, কাতার ও মিসরের মধ্যস্থতায় অবশেষে সফলতার মুখ দেখেছে বহু প্রতীক্ষিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি। ইসরাইল সরকার হামাসের সঙ্গে নতুন চুক্তি করে। রোববার থেকে শুরু গাজায় যুদ্ধবিরতি ও বন্দিবিনিময়। শুক্রবার ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রিসভা এই চুক্তি অনুমোদন করেছে।
চুক্তিতে মধ্যস্থতাকারী কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ জানিয়েছেন, আজ রোববার স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে গাজা উপত্যকায় ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়া শুরু করবে।
মাজেদ আল-আনসারি জানিয়েছেন, বাসিন্দাদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন এবং সরকারি নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে প্রথম ধাপে ছয় সপ্তাহের তথা ৪২ দিনের একটি প্রাথমিক যুদ্ধবিরতির সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
এদিকে গাজার সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, বুধবার রাতে ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার ঘোষণার পর থেকে ইসরাইলি হামলায় অন্তত ১২২ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৩ শিশু ও ৩৩ জন নারী। এদের মধ্যে গাজা শহরে ৯২ জন, খান ইউনিসে ১৯ জন, মধ্য গাজায় ১০ জন এবং আরও দুজন দক্ষিণের রাফাহ শহরের বাসিন্দা। সংস্থার মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল। ইউনিসেফ জানিয়েছে, ইসরাইলের ১৫ মাসের যুদ্ধে গাজায় প্রতিদিন প্রায় ৩৫ জন ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে। আর চুক্তির পর থেকে ২৭০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে সিভিল ডিফেন্স।
ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেল অব হিউম্যান রাইটস-এর প্রধান বলেছেন, বৃহস্পতিবার ভোরে গাজার রেমাল পাড়ার একটি বাড়িতে বিমান হামলা চালায় ইসরাইল। এতে প্রাণ হারান সেখানে আশ্রয় নেওয়া ফিলিস্তিনি মানবাধিকারকর্মী, তার স্ত্রী, শিশুসন্তানসহ চার সন্তান।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধে কমপক্ষে ৪৬ হাজার ৮৭৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং এক লাখ ১০ হাজার ৬৪২ জন আহত হয়েছে। সেদিন হামাস-নেতৃত্বাধীন হামলায় ইসরাইলে কমপক্ষে এক হাজার ১৩৯ জন নিহত এবং ২০০ জনেরও বেশিকে বন্দি করা হয়েছিল।
ইসরাইলের বিচার মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রথম পর্যায়ে ৭৩৭ ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হবে। তাদের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, বর্তমানে কারাগারে থাকা ৭৩৭ বন্দি মুক্তির অনুমোদন দিয়েছে সরকার। আর এর বিনিময়ে হামাস মুক্তি দেবে ৩৩ ইসরাইলি জিম্মিকে।
ইউএনআরডাব্লিউএ জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি শুরু হলে মানবিক দুর্ভোগ কমাতে ৪ হাজার ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন মানবিক সংস্থা সাহায্য বিতরণের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। এদিকে গাজার বিভিন্ন সড়ক থেকে ধ্বংসস্তূপ সরাতে কাজ শুরুর কথা জানিয়েছে স্থানীয় পৌর কর্তৃপক্ষ। নিজ বাড়িতে ফেরার বিষয়ে বাসিন্দাদের সতর্ক করেছে ফিলিস্তিনি পুলিশ। রাফাহ শহর বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায়, লোকজনকে তাদের বাড়ির কাছে না যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কারণ এসব বাড়িতে অবিস্ফোরিত বোমা থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছে তারা।
অন্যদিকে, এই যুদ্ধবিরতি চুক্তির জন্য ফিলিস্তিনিদের অভিনন্দন জানিয়েছেন হিযবুল্লাহপ্রধান নাইম কাসেম। তিনি বলেছেন, এই চুক্তি ‘অবিচল প্রতিরোধ প্রমাণ’ বা লক্ষ্য পূরণে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ থাকার প্রমাণ। এই চুক্তি ২০২৪ সালের মে মাসে প্রস্তাবিত চুক্তি থেকে অপরিবর্তিত ছিল। এই চুক্তির ফলে ইসরাইলের চাওয়া পূরণ হয়নি। তবে হামাস তার লক্ষ্য পূরণে সক্ষম হয়েছে। লেবাননের গোষ্ঠীর সঙ্গে ইসরাইলের যুদ্ধ গাজার বিজয়ে অবদান রেখেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।