লিওনেল মেসির জাদুকরী ফ্রি-কিক, লাউতারোর শট, আলমাদার চেষ্টা, একের পর এক আক্রমণ; বারবার প্রতিহত হলো ভোজিনহার দেয়ালে। ম্যাচের আগে বলছিলেন, সেরাটাই দেবেন। দিলেন তারচেয়ে কয়েকশো ভাগ বেশি। তাতে ম্যাচ নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গড়ালো অতিরিক্ত সময়ে, উঁকি দিচ্ছিল টাইব্রেকার ভাগ্য! তবে হতে দিলেন না ক্রিস্টিয়ান রোমেরো। তার হেডই গড়ে দিলো ভাগ্য। বাকি দুটি গোল এলো মেসি ও লিসান্দ্রো মার্টিনেজের পা থেকে। জিতল আজেন্টিনাই। লড়েও ৩-২ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলো কেপ ভার্দে। শেষ ষোলোতে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ মিসর।
মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে শুরু থেকেই বলের দখল ও আক্রমণে আধিপত্য দেখায় আর্জেন্টিনা। ম্যাচের ১৫ মিনিটেই প্রথম বড় সুযোগ পান লিওনেল মেসি, তবে তার বাঁ পায়ের শট অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। ১৮ মিনিটে ফ্রি-কিক থেকে আবারও গোলের চেষ্টা করেন অধিনায়ক, কিন্তু কেপ ভার্দের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনহা সহজেই বলটি তালুবন্দি করেন। এরপর ১৯ মিনিটে নাহুয়েল মোলিনার পাস থেকে মেসির আরেকটি শটও দারুণভাবে রুখে দেন ভোজিনহা।
কেপ ভার্দে শুরু থেকেই নিচু রক্ষণে খেললেও সুযোগ পেলেই পাল্টা আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করেছে। তবে আর্জেন্টিনার সংগঠিত রক্ষণ তাদের বড় কোনো সুযোগ তৈরি করতে দেয়নি।
ম্যাচের ২৯ মিনিটে অবশেষে কাঙ্ক্ষিত গোল পায় বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। লিসান্দ্রো মার্তিনেজের অসাধারণ লম্বা পাস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সংকীর্ণ কোণ থেকেও নিখুঁত ফিনিশিংয়ে জাল খুঁজে নেন লিওনেল মেসি। এই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে টানা পাঁচ ম্যাচে গোল করার বিরল কীর্তি গড়েন তিনি। এর আগে এই রেকর্ড ছিল ব্রাজিলের ভাভা, লিওনিদাস এবং হাঙ্গেরির জর্জি সারোসির দখলে।
এছাড়াও।এই গোলের মধ্য দিয়েই মেসি গড়েছেন আরও একটি অনন্য কীর্তি। ৩৯ বছর ৯ দিন বয়সে গোল করে তিনি বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে গোল করা সবচেয়ে বয়স্ক দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবলার হয়ে গেছেন। এতদিন রেকর্ডটি ছিল উরুগুয়ের কিংবদন্তি ওবদুলিও ভারেলার দখলে। তিনি ১৯৫৪ বিশ্বকাপে ৩৬ বছর বয়সে এই কীর্তি গড়েছিলেন। সাত দশকেরও বেশি পুরোনো সেই রেকর্ড এবার নিজের করে নিলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
শুধু তাই নয়, শেষ আট আন্তর্জাতিক ম্যাচে এটি ছিল মেসির টানা দ্বাদশ গোল। প্রথমার্ধের শেষ দিকে এনজো ফার্নান্দেজের শটও ভোজিনহার দারুণ সেভে প্রতিহত হয়। ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় আর্জেন্টিনা।
দ্বিতীয়ার্ধে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে মাঠে নামে কেপ ভার্দে। ৫৪ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজের ভুল ক্লিয়ারেন্স থেকে সুযোগ তৈরি হলেও এমিলিয়ানো মার্তিনেজ দুর্দান্ত সেভ করে দলকে রক্ষা করেন। তবে ৫৯ মিনিটে আর রক্ষা হয়নি। রায়ান মেন্ডেসের ডান প্রান্তের নিচু ক্রস থেকে ডেরয় দুয়ার্তে এমি মার্তিনেজের পায়ের ফাঁক দিয়ে বল জালে জড়িয়ে ম্যাচে সমতা ফেরান।
গোল হজমের পর একের পর এক আক্রমণ চালায় আর্জেন্টিনা। ৬২ মিনিটে মেসির জোরালো শট আবারও ভোজিনহার হাতে আটকে যায়। ৬৭ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজ ও নিকোলাস গনসালেসের সমন্বিত আক্রমণও সফল হয়নি। ৭৩ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া মেসির দুর্দান্ত ফ্রি-কিক অসাধারণ দক্ষতায় ফিরিয়ে দেন ভোজিনহা।
৮১ মিনিটে হুলিয়ান আলভারেসের শট গোললাইন থেকে ক্লিয়ার করেন রবার্তো লোপেস। শেষ দিকে আরও কয়েকটি আক্রমণে চাপ বাড়ায় আর্জেন্টিনা। যোগ করা সময়ে মেসির ফ্রি-কিক ভোজিনহা ঠেকিয়ে দেন, ফিরতি বলে এনজোর হেডও তিনি রুখে দেন অসাধারণ প্রতিক্রিয়ায়।
শেষ বাঁশি বাজার আগে আর কোনো দল গোল করতে না পারায় ১-১ সমতায় শেষ হয় নির্ধারিত ৯০ মিনিট। ফলে শেষ ষোলোর এই হাইভোল্টেজ লড়াইয়ের ভাগ্য নির্ধারণে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে।
আর্জেন্টিনার জন্য অতিরিক্ত সময় যেন বিশ্বকাপ নকআউটের এক পরিচিত অধ্যায়। সবশেষ ১৩টি নকআউট ম্যাচের মধ্যে সাতটিই গড়িয়েছে এক্সট্রা টাইমে। এর মধ্যে রয়েছে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের দুটি স্মরণীয় লড়াইও। সেবার কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ২-২ সমতার পর টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে জিতেছিল আলবিসেলেস্তেরা। আর ফাইনালে ফ্রান্সের সঙ্গে ৩-৩ ড্রয়ের পর পেনাল্টি শুটআউটে ৪-২ ব্যবধানে জিতে ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বকাপ ট্রফি ঘরে তোলে মেসির দল।
অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই সেই অভিজ্ঞতার ছাপ দেখায় আর্জেন্টিনা। ৯২তম মিনিটে (এক্সট্রা টাইমের দ্বিতীয় মিনিট) কর্নার থেকে উড়ে আসা বল দূরের পোস্টে পেয়ে জোরালো শটে জাল কাঁপান লিসান্দ্রো মার্তিনেজ। জাতীয় দলের হয়ে এটি তার দ্বিতীয় গোল। ম্যাচের প্রথমার্ধে লিওনেল মেসির গোলেও অ্যাসিস্ট করেছিলেন এই ডিফেন্ডার, পরে নিজেই গোল করে দলকে আবারও এগিয়ে দেন।
তবে কেপ ভার্দে সহজে হার মানার দল নয়, সেটি আরও একবার প্রমাণ করে তারা। ১০৩তম মিনিটে সিডনি লোপেজ কাবরাল বক্সের বাইরে থেকে দুর্দান্ত এক বাঁকানো শটে বল জড়িয়ে দেন জালের টপ কর্নারে। আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারকে কাটিয়ে নেওয়া সেই দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে আবারও ২-২ সমতায় ফেরে আফ্রিকার দল, আর ম্যাচে যোগ হয় নতুন নাটকীয়তা।
সমতা ফেরার মাত্র দুই মিনিট পরই আবারও নায়ক হয়ে ওঠেন কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়া। হুলিয়ান আলভারেজের পাস থেকে মেসির নেওয়া শক্তিশালী শট বাম দিকে ঝাঁপিয়ে অবিশ্বাস্য দক্ষতায় রুখে দেন তিনি। তার সেই সেভে ২-২ স্কোরলাইন অক্ষত থাকে এবং দুই দল অতিরিক্ত সময়ের বিরতিতে যায়।
বিরতির পরও আক্রমণের ধার কমায়নি আর্জেন্টিনা। ১১১তম মিনিটে মেসির কর্নার থেকে বক্সে ওঠা হেডে বল জালে পাঠান ক্রিস্টিয়ান রোমেরো। পরে অবশ্য সেটি কেপ ভার্দের ডিফেন্ডার বারগেসের আত্মঘাতী গোল হিসেবে গণ্য হয়। শেষদিকে আরেকটি দুর্দান্ত ফ্রি-কিক থেকে সমতা ফেরানোর সুযোগ পেয়েছিল কেপ ভার্দে, কিন্তু এবার এমিলিয়ানো মার্তিনেজ দুর্দান্ত সেভ করে দলকে রক্ষা করেন। পুরো ম্যাচে খুব বেশি ব্যস্ত না থাকলেও সেই মুহূর্তে কেন তাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক বলা হয়, সেটিই যেন আরেকবার প্রমাণ করলেন ‘এমি’। শেষ পর্যন্ত সেই সেভই নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনার স্বস্তির জয়।