বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ১১:৪৩ পূর্বাহ্ন

আদায় অযোগ্য খেলাপি ঋণ বাড়ছে

  • সময়: সোমবার, ২৪ মার্চ, ২০২৫, ১.৫৫ পিএম
  • ১৯ জন

ব্যাংক খাতে মন্দমানের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও হার দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণের ৮৪ শতাংশের বেশি মন্দমানের। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ এখন ২ লাখ ৯১ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা। গত ছয় মাসে এই ঋণ বেড়েছে প্রায় সোয়া ১ লাখ কোটি টাকা। আর মন্দঋণ বৃদ্ধির কারণে ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে।

সূত্রগুলো বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন বিভিন্ন ব্যাংক থেকে জাল-জালিয়াতি ও যোগসাজশের মাধ্যমে ঋণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা বের করে নেওয়া হয়েছে। এসব ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় জামানত না থাকায় তা আদায়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মন্দমানের ঋণ আদায়ের সম্ভাবনা খুব কম থাকে। ফলে এ মানের ঋণ বাড়লে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সক্ষমতা কমে যায়। কারণ এর বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন রাখতে হয়, যা তাদের নিট আয়ে প্রভাব ফেলে। এতে দুর্বল হয়ে পড়ে ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি। অন্যদিকে মন্দ ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যবস্থাপনার ব্যয়ও বাড়ছে।

নিয়ম অনুযায়ী, ঋণ শ্রেণিকরণের তিনটি ধাপ রয়েছে। খেলাপি হওয়ার পর তিন মাস থেকে ছয় মাস পর্যন্ত নিম্নমান, ছয় মাস থেকে ১২ মাস পর্যন্ত সন্দেহজনক এবং ১২ মাসের বেশি সময় খেলাপি থাকলে তা মন্দ ঋণ বা আদায় অযোগ্য ঋণ হিসেবে চিহ্নিত হয়। এই তিনটি পর্যায় বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংকগুলোকে নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) সংরক্ষণ করতে হয়। এর মধ্যে নিম্নমান ঋণের বিপরীতে ২০ শতাংশ, সন্দেহজনকের বিপরীতে ৫০ শতাংশ এবং মন্দমান বা ক্ষতিজনক ঋণের বিপরীতে শতভাগ প্রভিশন রাখতে হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৭ লাখ ১১ হাজার ৪০২ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে পড়েছে ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ২০ দশমিক ২০ শতাংশ। এর মধ্যে মন্দমানে খেলাপি হয়েছে ২ লাখ ৯১ হাজার ৫৩৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। এটি মোট খেলাপি ঋণের ৮৪ দশমিক ৩১ শতাংশ।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, মন্দঋণের আধিক্য বেশি রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকে। গত ডিসেম্বর শেষে এসব ব্যাংকে মন্দঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ২৪ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা। গত জুনে তাদের মন্দঋণের পরিমাণ ছিল ৭৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। ফলে ছয় মাসের ব্যবধানে এই ছয় ব্যাংকের মন্দঋণ বেড়েছে প্রায় ৪৫ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা। যদিও আলোচ্য ছয় মাসে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে মন্দঋণ বেড়েছে তুলনামূলক বেশি। এ সময় বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে মন্দঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৯ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা, যা জুনে ছিল ৮২ হাজার ৩০১ কোটি টাকা। ফলে ছয় মাসে তাদের মন্দঋণ বেড়েছে ৭৭ হাজার ১৬০ কোটি টাকা। অন্যদিকে এ সময়ে বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে মন্দঋণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এছাড়া বিদেশি ব্যাংকগুলোর মন্দঋণ রয়েছে ২ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা।

প্রতিবেদনে আরো দেখা যায়, ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মন্দঋণ রয়েছে জনতা ব্যাংকের, প্রায় ৬২ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চতুর্থ প্রজন্মের ইউনিয়ন ব্যাংকের মন্দঋণ দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ১২৬ কোটি টাকা। এর পরের অবস্থানে থাকা অগ্রণী ব্যাংকের মন্দঋণের পরিমাণ ২৩ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা। এছাড়া ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ২০ হাজার ৪৮৭ কোটি, সোনালী ব্যাংকের ১৫ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ১৫ হাজার ১৮০ কোটি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ১১ হাজার ৮৫ কোটি, রূপালী ব্যাংকের ১৩ হাজার ৪০৭ কোটি, আইএফআইসির ১০ হাজার ৭৩৬ কোটি, বেসিক ব্যাংকের ৮ হাজার ৪৯০ কোটি, এবি ব্যাংকের ৮ হাজার ২৬১ কোটি ও পদ্মা ব্যাংকের ৪ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকার মন্দঋণ রয়েছে।

মন্দঋণ বৃদ্ধিতে ব্যাংক খাতে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে প্রভিশন ঘাটতি বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের বিপরীতে অন্তত ১৩টি ব্যাংক প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছে। এসব ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯ হাজার ৩১৮ কোটি টাকা। তবে একই সময়ে কয়েকটি ব্যাংকের প্রভিশন উদ্বৃত্ত থাকায় ব্যাংক খাতের সার্বিক প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ১৩০ কোটি টাকা। আগের প্রান্তিকে অর্থাৎ সেপ্টেম্বর শেষে এই পরিমাণ ছিল ৫৫ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে ব্যাংক খাতের প্রভিশন ঘাটতি বেড়েছে ৫০ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা। এ সময় সর্বোচ্চ প্রভিশন ঘাটতিতে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক। এই ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ২৭ হাজার ১৬০ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংকের ঘাটতি ১৮ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। তৃতীয় অবস্থানে আছে শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি ১৩ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা। এছাড়া সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ১০ হাজার ৬০৩ কোটি, সোনালী ব্যাংকের ৯ হাজার ৩০ কোটি, অগ্রণী ব্যাংকের ৮ হাজার ৮৮৯ কোটি, আইএফআইসি ব্যাংকের ৭ হাজার ৮৮৬ কোটি, রূপালী ব্যাংকের ৭ হাজার ২২ কোটি, বেসিক ব্যাংকের ৫ হাজার ১৭০ কোটি, কমার্স ব্যাংকের ৫৩৩ কোটি, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ৩০৭ কোটি, ঢাকা ব্যাংকের ১৭৬ কোটি ও আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের ২ লাখ টাকার প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে।

আপনার সামাজিক মাধ্যমে খবরগুলো শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও খবর পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved by BUD News 24-2025
Developed BY www.budnews24.com