রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬, ০৪:৩০ পূর্বাহ্ন

ভারতের ‘র’-এর পরিকল্পনায় ১/১১ সরকার

  • সময়: শনিবার, ২৮ মার্চ, ২০২৬, ৯.১৬ এএম
  • ২৩ জন

ওয়ান-ইলেভেন সরকারের অন্যতম কুশীলব লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এখন ডিবি পুলিশের খাঁচায়। পাঁচদিনের রিমান্ডে থাকা এ কর্মকর্তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে সে সময়ের অনেক অন্ধকার অধ্যায়।

নির্ভরযোগ্য-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রমতে, রিমান্ডে তিনি জানিয়েছেন, বিতর্কিত ওয়ান-ইলেভেন সরকার গঠনে মূল পরিকল্পনা তৈরি করে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (‘র’)। এ বিষয়ে সংস্থাটি কাজে লাগায় তৎকালীন ডিজিএফআইয়ের কয়েকজন কর্মকর্তাকে। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাটি পরিকল্পনা শুরু করে ২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের মেয়াদের শেষদিকে। এদের যৌথ উদ্যোগে জাতিসংঘের তৎকালীন আবাসিক অফিসের সঙ্গে সমন্বয় করে বিশ্ব সংস্থাটির নামে ভুয়া চিঠি তৈরি করা হয়।

সূত্র জানায়, ডিবি পুলিশের পাঁচদিনের রিমান্ডে তদন্তসংশ্লিষ্ট প্রশ্নের বিভিন্ন জবাব এড়িয়ে যাচ্ছেন মাসুদ। অনেক ক্ষেত্রে তদন্তসংশ্লিষ্টদের উল্টো বয়ান দিচ্ছেন। ওয়ান-ইলেভেন সরকার গঠনে তার ভূমিকা, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে তৎকালীন সময়ে নির্যাতন করা এবং মানবপাচার করে অর্থ উপার্জনসহ নানা অভিযোগে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

গত সোমবার ২৩ মার্চ রাতে রাজধানীর বারিধারার ডিওএইচএস এলাকা থেকে মাসুদকে আটক করা হয়। পরদিন মঙ্গলবার ঢাকার পল্টন থানায় হওয়া মানব পাচার মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। তার পাঁচদিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে আদালত তা মঞ্জুর করে। তার বিরুদ্ধে ঢাকা ও ফেনীতে ১১টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। ওয়ান-ইভেলেনের কোনো ভুক্তভোগী অভিযোগ করলে তা-ও তদন্ত করে দেখার কথা বলেছে পুলিশ।

রিমান্ড শুনানি শেষে হাজতখানায় নেওয়ার সময় সিএমএম আদালত প্রাঙ্গণে বিক্ষোভের মুখে পড়েন মাসুদ উদ্দিন। এ সময় উত্তেজিত জনতা তাকে লক্ষ্য করে ময়লা পানি নিক্ষেপ করে এবং বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, তাকে পোড়া মবিল ছুড়ে মারা হয়েছিল। এ সময় পুলিশ দ্রুত তাকে হাজতখানায় নিয়ে যায়।

রিমান্ডে মাসুদের লুকোচুরি ও দোষারোপের রাজনীতি

ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদের সময় জেনারেল মাসুদ অনেকটা ‘সাধু’ সাজার চেষ্টা করেন। তিনি ১/১১-এর সব বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের দায় তৎকালীন ডিজিএফআইয়ের তিন প্রভাবশালী কর্মকর্তাÑমেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) চৌধুরী ফজলুল বারী এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দারের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন। তিনি দাবি করছেন, ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা বাস্তবায়ন এবং কিংস পার্টি গঠনের মূল কারিগর ছিলেন এটিএম আমিন। তবে তদন্তকারীরা বলছেন, নবম ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি হিসেবে মাসুদের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি আক্রমণাত্মক। বিশেষ করে বিএনপির চেয়ারপারসন মরহুমা খালেদা জিয়া এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর অমানবিক নির্যাতনের যে অভিযোগ রয়েছে, তার মূল নির্দেশদাতা ছিলেন এ মাসুদ।

জানা যাচ্ছে, ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে বিএনপি জোট সরকারের সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর পিএস ছিলেন সাইফুল ইসলাম ডিউক। ডিউক তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বোনের ছেলে। ডিউকের ভায়রা ভাই হলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল। ব্রিগেডিয়ার আমিন ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মেজর জেনারেল হিসেবে অবসরে যান আর ব্রিগেডিয়ার বারী ১/১১ সরকারের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ দূতাবাসে অ্যাটাশে নিযুক্ত হওয়ার পর আর দেশে আসেননি।

১/১১-এর নেপথ্যে বিদেশি প্রেসক্রিপশন

রিমান্ডে ১/১১ সরকারের পেছনের কিছু তথ্য ধীরে ধীরে তুলে ধরছেন জেনারেল মাসুদ। তিনি তদন্তকারীদের জানান, বিএনপি সরকারের শেষদিকে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টন মোড়ে জামায়াত-শিবিরের চারজন নেতাকর্মীকে লগি-বৈঠা দিয়ে হত্যা করে লাশের ওপর নৃত্য করে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ অঙ্গসংগঠন ও ১৪ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা। এর পেছনে ছিল সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের বিপরীতে ভিন্ন ধরনের সরকার গঠনের ভারতীয় পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পূর্বপরিকল্পিতভাবে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। পাশাপাশি জাতিসংঘের তৎকালীন আবাসিক প্রতিনিধিকে ম্যানেজ করে ভুয়া চিঠি তৈরি করা হয়। এ সময় দেশে এক ভয়াবহ নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট। পূর্বপরিকল্পনার ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইয়াজ উদ্দিন আহম্মেদের সরকার হটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন বিএনপির নিয়োগ দেওয়া সে সময়ের সেনাপ্রধান মঈন উ আহমেদ এবং সাভারের ৯ম ডিভিশনের জিওসি মাসুদ উদ্দিন। ওয়ান-ইলেভেনের পেছনে কর্নেল (অব.) অলির যোগসাজশ রয়েছে বলেও দাবি করেন রিমান্ডে থাকা মাসুদ চৌধুরী।

দুর্নীতির পাহাড় ও মানবপাচার সিন্ডিকেট

মাসুদ উদ্দিনের বিরুদ্ধে শুধু রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রই নয়, বরং হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নামে তিনি গঠন করেছিলেন এক বিশাল সিন্ডিকেট। ‘ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল’ নামক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি ও তার সহযোগীরা প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ পাচারের মামলা দায়ের হয়েছে। রিমান্ডে এ বিশাল অর্থের উৎস এবং গন্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি নিরুত্তর থাকছেন অথবা অত্যন্ত অপ্রাসঙ্গিক কথা বলছেন। তদন্তকারীরা জানান, দুর্নীতির প্রশ্নে তিনি নিজেকে ‘মহাযুধিষ্ঠি’হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করলেও নথিপত্র বলছে ভিন্নকথা।

জুলাই গণহত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততা

সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগটি এসেছে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলন ঘিরে। ফেনীর মহিপালে গুলিতে ১১ জন নিহতের ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলাগুলোর অন্যতম প্রধান আসামি তিনি। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তার বিরুদ্ধে ঢাকা ও ফেনীতে অন্তত ১১টি মামলা হয়েছে। ক্ষমতার দাপটে তিনি একসময় নিজেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে মনে করলেও এখন আইনি জালে আটকা পড়েছেন। আদালত প্রাঙ্গণে তাকে নেওয়ার সময় বিক্ষুব্ধ জনতা যেভাবে তার ওপর ময়লা পানি ও পোড়া মবিল নিক্ষেপ করেছে, তা থেকেই বোঝা যায় জনমনে তার প্রতি কতটা ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়ে আছে।

আপনার সামাজিক মাধ্যমে খবরগুলো শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও খবর পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2025 © All rights reserved by BUD News 24
Theme Developed BY ThemesBazar.Com