বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) সদস্য দেশগুলো। বছরের শুরুতেই এ বাজারে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা দিয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইইউর বাজারে দেশের পোশাক রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পর ইইউভুক্ত দেশগুলোতে তৈরি পোশাক রপ্তানি কমে যাওয়াতে খাতসংশ্লিষ্টদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইউরোপীয় দেশগুলোর সংস্থাটির অধীন পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইইউতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৫ দশমিক ২৫ শতাংশ কমেছে। এ সময়ে রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪৩ কোটি ইউরো, যেখানে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ছিল ১৯১ কোটি ইউরো। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৪৮ কোটি ইউরো রপ্তানি আয় কমে গেছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই পতনের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি হলো রপ্তানির পরিমাণ হ্রাস এবং পণ্যের গড় মূল্য কমে যাওয়া। পরিসংখ্যান বলছে, জানুয়ারিতে রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ১৭ দশমিক ৪৯ শতাংশ। একই সময়ে প্রতি কেজি পোশাকের গড় দাম কমেছে ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় অর্ধেক আসে ইইউ থেকে। তাই এই বাজারে এমন পতন দীর্ঘস্থায়ী হলে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তারা বলছেন, বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতির পরিবর্তন, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত রদবদল এবং বিভিন্ন বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতার কারণে প্রতিযোগী দেশগুলো এখন ইউরোপীয় বাজারে বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। চীন, ভারত, ভিয়েতনামসহ অন্য রপ্তানিকারক দেশগুলো এই বাজারে অবস্থান শক্ত করতে জোরালো প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। যার ফলে প্রতিযোগিতা আরো তীব্র হয়েছে।
অন্যদিকে, ইউরোপের ভোক্তা বাজারেও দুর্বলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এতে পোশাকের চাহিদাও সেখানে কিছুটা কমেছে। উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়, সুদের হার বৃদ্ধি ও খুচরা বিক্রিতে ধীরগতির কারণে পোশাকের চাহিদা কমছে। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা আগের চেয়ে বেশি সতর্ক হয়ে অর্ডার দিচ্ছেন। বাড়তি প্রতিযোগিতার কারণে ক্রেতারা এখন বেশি দর কষাকষি করছেন এবং কম দামে পণ্য কিনতে চাইছেন। যা সরবরাহকারী দেশগুলোর ওপর মূল্যছাড়ের চাপ বাড়াচ্ছে।
ইইউতে অন্যান্য প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোর অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। চীন ২২২ কোটি ইউরোর পোশাক রপ্তানি করলেও তাদের রপ্তানি মূল্য কমেছে ৬ দশমিক ৯০ শতাংশ। দেশটির ক্ষেত্রে পরিমাণে সামান্য বৃদ্ধি থাকলেও ইউনিট মূল্য কমে যাওয়ায় মোট আয় কমেছে। তুরস্ক সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে, যেখানে রপ্তানি কমেছে ২৯ দশমিক ১২ শতাংশ। এছাড়া ভারত, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়াসহ বেশিরভাগ দেশই নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধির মুখে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রতিফলন। ইউরোপের বাজারে ভোক্তা আস্থা কমে যাওয়া এবং খুচরা খাতে বিক্রি হ্রাস পাওয়ায় নতুন অর্ডার কমেছে। একই সঙ্গে বাজার ধরে রাখতে অনেক দেশ বাধ্য হয়ে পণ্যের দাম কমাচ্ছে, যা প্রতিযোগিতাকে আরো কঠিন করে তুলেছে।
এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত এবং কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। শুধু স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ নয়, দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণের ওপরও জোর দিতে হবে।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল আমার দেশকে বলেন, পুরো ইইউ বাজারেই পোশাক আমদানিতে মন্দা চলছে। নেতিবাচক প্রভাব শুধু বাংলাদেশের উপরেই নয়, বরং অন্যান্য প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোর অবস্থাও একই। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইইউর মোট পোশাক আমদানি কমে প্রায় ৭ দশমিক ০৩ থেকে ৭ দশমিক ৩ বিলিয়ন ইউরোর মধ্যে রয়েছে। শতকরার হিসাবে তা ১৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
একই সময়ে আমদানির পরিমাণ কমেছে ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ ও গড় ইউনিট মূল্য কমেছে ৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ। এতে বোঝা যাচ্ছে, সামগ্রিকভাবে ইইউ বাজারে পোশাকের চাহিদা কমেছে। এছাড়াও তারা তাদের এই সময়ের চাহিদার পণ্য আগেই নিয়ে নিয়েছে, যার জন্য জানুয়ারি মাসের রপ্তানি কমে গিয়েছে।
তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশকে ডিটুসি (ডিরেক্ট টু কনজ্যুমার) প্রক্রিয়াতে অগ্রগতি অর্জন করতে হবে। যেখানে রপ্তানিকারকরা মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই বিশ্বের গ্রাহকদের কাছে পণ্য বিক্রি করবেন। ডিটুসি প্রক্রিয়াতে চীন দ্রুত অনলাইনে ক্রেতার কাছে নিজেদের পণ্য তুলে ধরছে। তাছাড়া আমাদেরকে ইইউ বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানেও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
খাতসংশ্লিষ্টদের পরামর্শ অনুযায়ী, পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, উচ্চমূল্যের পোশাকে গুরুত্ব দেওয়া, মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মান ও কমপ্লায়েন্স উন্নত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বাণিজ্য কূটনীতি জোরদার, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং বিদ্যমান বাজারে অবস্থান শক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।