সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬, ০২:৪৯ অপরাহ্ন

দ্বিতীয় সপ্তাহেও লড়ছে ইরান

  • সময়: রবিবার, ৮ মার্চ, ২০২৬, ৯.০৬ এএম
  • ৩৪ জন

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ ৪০ জনের বেশি শীর্ষ কর্মকর্তাকে হত্যার পর ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের ভাবনা ছিলÑতেহরানের আত্মসমর্পণ এখন সময়ের ব্যাপারমাত্র। মার্কিন-ইসরাইল হামলায় পর্যুদস্ত হয়ে তেহরান সরকারের পতন ঘটবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আহ্বানে সাড়া দিয়ে রাস্তায় নেমে আসবে ইরানের সাধারণ জনগণ। কিন্তু বাস্তবে তার কিছুই ঘটেনি। বরং অসীম সাহসের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চাপিয়ে দেওয়া অন্যায্য যুদ্ধের বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছে ইরান।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নারকীয় এক হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে যে অসম যুদ্ধ শুরু করে তা আজ দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। আত্মসমর্পণ নয়, বরং পাঁচ হাজার বছরের সভ্যতার চারণভূমি ইরান তার আত্মমর্যাদা রক্ষায় সর্বশক্তি দিয়ে লড়ে যাচ্ছে।

এই যুদ্ধ কত দিন চলবে বা কীভাবে শেষ হবেÑ এই মুহূর্তে তার উত্তর কারো জানা নেই। বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ঈশান থারুর নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, মার্কিন ও ইসরাইলি বিমান হামলা ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করেছে, সৃষ্টি করেছে আঞ্চলিক অস্থিরতা, যুদ্ধ শুরুর মাধ্যমে একটি কৌশলগত জুয়া খেলেছে তারা। তবে এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল আদৌ জয়ী হতে পারবে কি নাÑ সেই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে সামনে এসেছে। অন্যদিকে তেহরানের শাসকগোষ্ঠী জানে, তারা হয়তো এই যুদ্ধে সরাসরি জয়ী হতে পারবে না, তবে তারা অবশ্যই এই সংঘাতের যন্ত্রণাকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পাশাপাশি গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে দিতে পারবে। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে গত আট দিনের যুদ্ধের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া বিশ্বব্যাপী দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল দাবি করছে, তাদের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সামরিক শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। দেশটির আকাশ প্রতিরোধী ব্যবস্থা, বিমান বাহিনী, নৌবাহিনী এবং নেতৃত্ব কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই কথারই পুনরাবৃত্তি করে বলেছেন, ‘ইরানি কর্তৃপক্ষ আমার সঙ্গে আলোচনায় বসতে চেয়েছিল, কিন্তু আমি বলেছিÑ অনেক দেরি হয়ে গেছে’। তবে বাস্তব পরিস্থিতি বলছে ভিন্ন কথা। ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে সেগুলোকে লক্ষ্য করে অব্যাহতভাবে মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। এই হামলায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল এবং তাদের মিত্র দেশগুলো এখন রীতিমতো নাজেহাল। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ধারণাÑ ইরান এই যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করে তার প্রতিপক্ষের ওপর উল্টো চাপ সৃষ্টিতে সক্ষম হচ্ছে।

র‌য়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ড. এইচ এ হেলার বলছেন, প্রথাগত যুদ্ধ চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে পরাজিত করার কোনো চেষ্টাই করছে না ইরান। দেশটি এই সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করার মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। তিনি বলেন, ইরান হয়তো এই যুদ্ধে জিততে পারবে না, তবে তাদের কৌশল হলোÑ প্রতিপক্ষের সম্ভাব্য জয়কে অনিশ্চিত করে দেওয়া। ইরানের এই কৌশল কার্যকর হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

ফ্রান্সের সিয়ঁসপোয়ের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক নিকোল গ্রাজেউস্কি বলেন, ইরান এখন যুদ্ধক্ষেত্রে তার প্রতিপক্ষের সক্ষমতা কমানোর কৌশল নিয়েছে। এই কৌশলের ফলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হতে পারে। ফলে প্রতিপক্ষের অস্ত্র, যুদ্ধ সরঞ্জাম এবং লোকবল ধীরে ধীরে কমতে থাকবে। কমে আসবে লড়াই করার ক্ষমতা।

তিনি বলেন, ইরান তার ড্রোন আক্রমণের মাধ্যমে এই কৌশলেরই বাস্তবায়ন করতে চাইছে। এই কৌশলের একটি মনস্তাত্ত্বিক দিকও রয়েছে। এখানে নির্ভুল নিশানায় হামলা পরিচালনার ব্যাপারটা খুব বেশি গুরুত্ব পায় না। বরং অব্যাহতভাবে হামলা চালিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া যায়। দীর্ঘমেয়াদে যার ফলাফল হয় অত্যন্ত তীব্র। ইতোমধ্যে এই কৌশলের কার্যকারিতাও চোখে পড়ছে। ইরানের হামলা থেকে বাঁচতে ইসরাইলের অধিকাংশ জনগণ এখন ঘরবাড়ি ছেড়ে বাঙ্কারে আশ্রয় নিয়েছে।

ইসরাইলের হিসাব অনুযায়ী, ইরানের কাছে আড়াই হাজারের বেশি অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। এর পাশাপাশি ৮০ হাজারের বেশি ড্রোন রয়েছে বলে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ধারণা। গত আট দিনে এই বিপুল অস্ত্র ভাণ্ডারের ছোট একটি অংশই ব্যবহার করা হয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক হেলার মনে করেন, ইসরাইলের স্থাপনা, এ অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে তাদের মিত্রদের ওপর হামলা চালানোর ক্ষমতা যেমন ইরানের রয়েছে, তেমনি হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে তেহরান। হরমুজ প্রণালিতে সামান্যতম বিঘ্ন বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশ্বের জ্বালানি তেলের ২০ শতাংশই এ প্রণালি দিয়ে পারাপার করা হয়, যা এখন ইরান কার্যত বন্ধ রেখেছে। ইতোমধ্যে অস্থির হয়ে পড়েছে জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার, যার প্রভাব বিশ্বের সব দেশের ওপর কমবেশি পড়ছে।

সামরিক দিক থেকে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র ইরান। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের ‘মিলিটারি ব্যালেন্স ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের প্রায় ছয় লাখ ১০ হাজার সৈন্য সব সময় প্রস্তুত থাকে। এর মধ্যে সাড়ে তিন লাখ সরাসরি সেনাবাহিনীতে রয়েছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি), যারা নিয়মিত দায়িত্বের পাশাপাশি ইরানের মিসাইল ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে, তাদের সংখ্যাই এক লাখ ৯০ হাজার। এর বাইরে হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠী, লেবাননে হিযবুল্লাহ এবং গাজায় হামাসসহ ইরানের কিছু আঞ্চলিক মিত্র রয়েছে। তাদের সবাই দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত মোকাবিলায় অভিজ্ঞ।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক শীর্ষ নেতৃত্ব কতটা এক থাকতে পারেন এবং তাদের মধ্যে কোনো ধরনের বিভেদ আছে কি না, তার ওপরই নির্ভর করবে তেহরান দীর্ঘমেয়াদি একটি যুদ্ধে কতটা টিকে থাকতে পারবে। তবে আপাতদৃষ্টিতে তেহরানের সামনে এ ধরনের কোনো ঝুঁকি নেই।

এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ শেষ করতে ইরানি কর্তৃপক্ষকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে ট্রাম্পের সে আহ্বানে কোনো সাড়া মেলেনি। বরং গতকাল শনিবারও ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে ইরান।

ইরানের সঙ্গে মার্কিন-ইসরাইল যুদ্ধকে বড় ধরনের ভুল বলে অভিহিত করেছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। তিনি বলেন, এ সংঘাত কোনোভাবেই বৈধ নয়। আন্তর্জাতিক আইন এটাকে অনুমোদন করে না। মিত্র দেশগুলো যদি কখনো ভুল করে, তখন আমাদের উচিত এ ভুলগুলো তুলে ধরা।

জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মেৎস বলেছেন, ইরানি জনগণের স্বাধীনভাবে তাদের নিজস্ব ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার রয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরানকে কোনোভাবেই প্রক্সি যুদ্ধের ক্ষেত্র করে তোলা উচিত হবে না। এ যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হবে।

গতকাল ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ইরানকে লক্ষ্য করে চালানো কোনো হামলায় নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহার না হলে প্রতিবেশী দেশগুলো নিরাপদ থাকবে।

নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এ সংঘাত ওয়াশিংটনের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক অভিযান হিসেবে প্রমাণ হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র তার নিজের প্রয়োজনে এ যুদ্ধে জড়ায়নি; বরং ইসরাইলের প্ররোচনাতেই যুদ্ধে জড়িয়েছে দেশটি। ইসরাইল তার জন্মলগ্ন থেকেই কখনো সুন্নি চরমপন্থা, কখনোবা শিয়া চরমপন্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা বলে মূলত মুসলিম বিশ্বকে টার্গেট করেছে, যার মূল উদ্দেশ্য বৃহত্তর ইসরাইল রাষ্ট্র গঠন। ইসারইল ও যুক্তরাষ্ট্র আসলে ইরানে আক্রমণের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু ইরান সম্পর্কে তাদের মূল্যায়ন ছিল ভুল। ইরান হলো গভীর উপনিবেশবিরোধী মনোভাবের এক বিপ্লবের ফসল। জাতীয়তাবাদী ও আদর্শিক দিক থেকে প্রচণ্ডভাবে স্বাধীনচেতা এক জাতি।

ইরানি জাতি পশ্চিমা সমর্থিত এক রাজাকে উৎখাত করে তাদের নিজস্ব শাসনব্যবস্থা কায়েম করেছে। মোল্লা বলে ইরানি নেতৃত্বকে এলোমেলো করে কারো পক্ষেই উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। ইরান এখন কেবল ইসারইল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই নয়; বরং এ অঞ্চলের ইসরাইলি আধিপত্যের পৃষ্ঠপোষক সবার বিরুদ্ধেই লড়ছে। কয়েক দশকের মধ্যে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের মতো একটি সুসংগঠিত সামরিক বাহিনীর মুখোমুখি হতে হয়েছে। দেশ দুটি ইরানের ওপর যে অন্যায্য যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে, তার কোনো রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বৈধতা নেই। রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বৈধতা ছাড়া সামরিক সক্ষমতা এবং নিয়ন্ত্রণহীন শক্তি সম্ভাব্য পতনকে রোধ করার পরিবর্তে পতন ত্বরান্বিত করে। আগামীতে কোনো এক সময় হয়তো ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র এ সত্যের মুখোমুখি হবে।

আপনার সামাজিক মাধ্যমে খবরগুলো শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও খবর পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2025 © All rights reserved by BUD News 24
Theme Developed BY ThemesBazar.Com