মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার জবাবে ইরান পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছে। ইরান সরাসরি ইসরাইলের পাশাপাশি উপসাগরীয় যেসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেসব দেশকেও লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। বিশেষ করে জ্বালানি অবকাঠামো—তেল শোধনাগার, গ্যাসক্ষেত্র ও রপ্তানি স্থাপনায় ড্রোন হামলা চালানো হচ্ছে।
কোন কোন দেশে কী ঘটেছে?
সৌদি আরবে ড্রোন হামলার পর রাস তানুরা তেল শোধনাগার সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে। এটি দেশটির অন্যতম বড় শোধনাগার, যেখানে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ ব্যারেল তেল পরিশোধন করা হয়।
কাতারে রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জির একটি স্থাপনায় দুটি ড্রোন আঘাত হানার পর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন বন্ধ করা হয়েছে। বিশ্বে মোট এলএনজি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ কাতার থেকে আসে। ফলে এই উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া বৈশ্বিক বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
কুয়েতে আহমাদি তেল শোধনাগারের কাছে ড্রোন ভূপাতিত করার পর তার ধ্বংসাবশেষে দুই কর্মী আহত হয়েছেন।
এ ছাড়া ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের বেশির ভাগ তেলক্ষেত্র এবং ইসরাইলের কয়েকটি গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদনও বন্ধ হয়ে গেছে। কাতারের দোহা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
হরমুজ প্রণালি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
হরমুজ প্রণালি বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে রপ্তানি হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর থেকেই এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে প্রতিদিন প্রায় এক কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন বাধাগ্রস্ত হতে পারে, যা বিশ্বে দৈনিক মোট তেল ব্যবহারের প্রায় ১০ শতাংশ।
এর প্রভাব ইতোমধ্যে বাজারে দেখা গেছে। একদিনে তেলের দাম ১৩ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৮২ ডলারে উঠেছে, যা ২০২৫ সালের জানুয়ারির পর সর্বোচ্চ।
ইরান কেন জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করছে?
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই কৌশলের পেছনে কয়েকটি উদ্দেশ্য থাকতে পারে—
১. বিশ্ববাজারে চাপ সৃষ্টি করা, যাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দ্রুত যুদ্ধ বন্ধে উদ্যোগী হয়।
২. যুক্তরাষ্ট্রের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ানো, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের ওপর।
৩. উপসাগরীয় দেশগুলোকে বার্তা দেওয়া যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বহন করলে তার মূল্য দিতে হবে।
৪. তেল ও গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে অস্থির করা।
উপসাগরীয় দেশগুলোকে কেন “সহজ লক্ষ্য” বলা হচ্ছে?
কিছু বিশ্লেষকের মতে, ইসরাইলের মতো উন্নত ও বহুস্তরবিশিষ্ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উপসাগরীয় দেশগুলোর নেই। তাই ইরান তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে সেসব দেশে হামলা চালাতে পারছে। এছাড়া এসব দেশ সরাসরি এই যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী নয়, ফলে তারা বড় আকারে পাল্টা আঘাতও করছে না।
বিশ্ব অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
স্বল্পমেয়াদে দেশগুলো তাদের মজুত তেল দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে। কিন্তু যুদ্ধ যদি তিন–চার সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে চলে—
তেলের দাম আরও দ্রুত বাড়তে পারে
গ্যাসের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে
ইউরোপ ও এশিয়ায় জ্বালানির ঘাটতি তৈরি হতে পারে
খাদ্য ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে পারে
বিশেষ করে দুবাই, দোহা, আবুধাবি ও কুয়েতের মতো শহরগুলো খাদ্য ও অন্যান্য মৌলিক পণ্যের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে এসব পণ্যের সরবরাহে টান পড়বে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি অবকাঠামো সরাসরি যুদ্ধের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে। এর ফলে শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, খাদ্য সরবরাহ এবং বিশ্ব অর্থনীতিও বড় ঝুঁকির মুখে পড়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে।