বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ০৮:২৯ অপরাহ্ন

বিএসইসিতে ভেঙে পড়েছে চেইন অব কমান্ড

  • সময়: রবিবার, ৯ মার্চ, ২০২৫, ৪.২৭ পিএম
  • ৩৪ জন

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) হযবরল অবস্থা বিরাজ করছে। ভেঙে পড়েছে চেইন অব কমান্ড। বর্তমান কমিশনকে অদক্ষ-অযোগ্য ও পুঁজিবাজার বিষয়ে অনভিজ্ঞতার অভিযোগ তুলে নতুন কমিশন নিয়োগের দাবি কর্মকর্তাদের। অপরদিকে চেয়ারম্যানসহ কমিশনারদের অবরুদ্ধ করার ঘটনায় দায়ী করে ১৬ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধে মামলা দায়েরের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিষ্ঠানের কমিশন ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরস্পরবিরোধী অবস্থান দেশের শেয়ারবাজারের জন্য তো বটেই, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও নেতিবাচক বার্তা হিসেবে কাজ করবে। দ্রুত এ সংকট সমাধানে সরকারের হস্তক্ষেপ জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানতে চাইলে বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী আমার দেশকে বলেন, কমিশন ও কর্মকর্তাদের পরস্পরবিরোধী অবস্থানের কারণে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে সরকারের হস্তক্ষেপ জরুরি। কমিশন বা কর্মকর্তাদের পক্ষে এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তৃতীয় কোনো ব্যক্তি বা পক্ষের মাধ্যমে এ সংকট সমাধানে অর্থ উপদেষ্টার উদ্যোগ নেওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের অবরুদ্ধ রাখার বিষয়টি একেবারেই সমর্থন করা যায় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, যারা এ কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন তারা অপরাধ করেছেন, তাদের আচরণ উদ্ধত্যপূর্ণ। এ ঘটনায় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ফলে তারা এখন অফিস করতে পারবেন না, ফলে কমিশনের কর্মকাণ্ডে ব্যাঘাত ঘটবে।

বিএসইসির তদন্ত কমিটির বিষয়ে তিনি বলেন, সিনিয়র সচিবের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি হওয়া উচিত ছিল এবং কমিটিতে শেয়ারবজারের ইন্টারমিডয়টরি কাউকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত হয়নি।

প্রসঙ্গত, গত ৫ মার্চ বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমানের বাধ্যতামূলক অবসরের আদেশ প্রত্যাহার, বিতর্কিত তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে কর্মকর্তাদের শোকজ প্রদান বন্ধ ও পূর্বে দেওয়া শোকজ প্রত্যাহার করে ক্ষমা প্রার্থনা, ১২৭ কর্মকর্তার নিয়োগের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলায় অভিজ্ঞ আইনজীবী নিয়োগ ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের জন্য ক্ষমা প্রার্থনার তাৎক্ষণিক দাবি জানানো হয়। আর এসব দাবি পূরণ করতে না পারলে এখনই পদত্যাগ করতে হবেÑ এমন একটি লিখিত দাবিনামা পেশ করে কমিশনের চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদসহ কমিশনের তিন সদস্যকে বোর্ডরুমে অবরুদ্ধ রাখা হয়। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের আগারগাঁওয়ে অবস্থিত বিএসইসি ভবনের সিসি ক্যামেরা খুলে নিয়ে বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।

চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের অভিযোগ, এ সময় তাদের দিকে রিমোট কন্ট্রোল ও বিভিন্ন বস্তু ছোড়া হয়। প্রায় চার ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর সেনাসদস্যরা এসে চেয়ারম্যানসহ কমিশনারদের উদ্ধার করেন। এরপর এক ঘণ্টা পর সেনা প্রহরায় অফিস ত্যাগ করেন তারা। এরপর বিএসইসির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কমিশনের পদত্যাগের দাবিতে ৬ মার্চ কর্মবিরতি পালন করেন। কর্মবিরতির দিনে বেলা ৩টার দিকে কমিশনের চেয়ারম্যান সেনা প্রহরায় কড়া নিরাপত্তাবেষ্টনীতে কার্যালয়ে আসেন এবং কারো অন্যায়ের কাছে নতিস্বীকার করবেন না বলেও জানান তিনি। ওই দিনই বিএসইসি চেয়ারম্যানের গানম্যান আশিকুর রহমান বাদী হয়ে বিএসইসির সাবেক নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমানসহ বর্তমান ১৬ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।

এদিকে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলাম এবং মহাসচিব ও ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী এক বিবৃতিতে কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের অবরুদ্ধ রাখার ঘটনাকে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ, আইনবিরোধী ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ বর্ণনা করে দোষীদের চিহ্নিত করে শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। অপরদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতির দ্রুত অবসানের জন্য ডিএসই ব্রোকারেজ হাউস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হয়েছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় কমিশনের ভূমিকা নিয়ে স্পষ্ট কিছু জানা যায়নি। তবে পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা চালিয়ে যাবে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কমিশনের এক সদস্য আমার দেশকে জানান।

তিনি বলেন, কমিশন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছে। তাদের এখতিয়ার নিয়ে কোনো কর্মকর্তার প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। কমিশনের অদক্ষতা বা অযোগ্যতার বিষয়টি সরকার নির্ধারণ করবে, কর্মরতদের এ নিয়ে কথা বলার কোনো এখতিয়ার নেই। কমিশন তার দায়িত্ব অনুযায়ী কাজ চালিয়ে যাবে।

তিনি আরো বলেন, যেকোনো প্রতিষ্ঠান চালানোর জন্য চেইন অব কমান্ড খুব জরুরি। চেইন অব কমান্ড না থাকলে যতই দক্ষ ও যোগ্য লোক হোক না কেন, প্রতিষ্ঠান চালানো সম্ভব নয়। কমিশনের কর্মকর্তারা সেই চেইন অব কমান্ড মানতে চান না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সূত্রে জানা গেছে, তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে দুর্নীতির কারণে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমানকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় কমিশন। এ ছাড়া যেসব কর্মকর্তার নাম এসেছে কমিশন তাদের শোকজ করে। বিভাগীয় ব্যবস্থা হিসেবে শোকজ করা হলেও এটা মানতে রাজি নন ওই কর্মকর্তারা। মূলত সাইফুর রহমানকে অবসরে পাঠানোকে কেন্দ্র করে দুর্নীতির কারণে অভিযুক্তরা একজোট হয়ে কমিশনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। বিভিন্ন কারণে বিক্ষুব্ধ বা সংক্ষুব্ধ কর্মকর্তারাও এদের সঙ্গে যোগ দেন। ফলে পুরো কমিশন ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে পরস্পরবিরোধী অবস্থান তৈরি হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিভিন্ন সময়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে অনিয়মের সঙ্গে তিন ধরনের লোকের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এরমধ্যে রয়েছে এক শ্রেণির বিনিয়োগকারী, যারা শেয়ার বেচাকেনার মাধ্যমে কারসাজির ঘটনা ঘটিয়েছেন। এসব কারসাজি চক্রের বিরুদ্ধে কমিশন জরিমানা করেছে। দ্বিতীয় শ্রেণির মধ্যে রয়েছেন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও কমিশনাররা। কমিশন ইতোমধ্যে তাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুনানি করেছে এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) চিঠি দেওয়া হয়েছে। তৃতীয় শ্রেণির মধ্যে রয়েছেন কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তারা। দায়িত্ব অবহেলার মাধ্যমে কিংবা যোগসাজশ করে দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। বিভাগীয় ব্যবস্থা হিসেবে এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শোকজ ইস্যু করা হয়। মূলত এ শোকজ ইস্যুকে কেন্দ্র করেই কমিশনে অস্থিরতা তৈরি করা হচ্ছে।

তবে কয়েকজন কর্মকর্তার অভিযোগ, কমিশন ঢালাওভাবে সব কর্মকর্তাকে দুর্নীতিবাজ আখ্যা দিয়ে বিভিন্ন ধরনের অশোভন আচরণ করে আসছে। কথায় কথায় শোকজ ইস্যু করা হয়েছে, হাস্যকর অনেক কারণেও শোকজ ইস্যু করা হয়েছে। ফলে এ কমিশনের অধীনে কেউ কাজ করতে চান না। কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য কমিশনে যোগ্য লোক নিয়োগ দেওয়া আবশ্যক বলে তারা জানান।

আপনার সামাজিক মাধ্যমে খবরগুলো শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও খবর পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved by BUD News 24-2025
Developed BY www.budnews24.com