ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত অটোয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনে কর্মরত মিথিলা ফারজানা এবং অপর্ণা পালকে কানাডায় পালিয়ে থাকতে সহযোগিতা করেছে খোদ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
গত বছর ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবে শেখ হাসিনা উৎখাত হওয়ার পর নজিরবিহীন দ্রুততায় বেআইনিভাবে আলোচিত এই দুই কর্মকর্তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট সাধারণ পাসপোর্টে পরিবর্তনের অনুমোদন দেয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনের নির্দেশে এই দুই কর্মকর্তার ফাইল প্রস্তুত করা হয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে তিনি সে ফাইল অনুমোদন করেন।
সংশ্লিষ্ট নথিতে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন মহাপরিচালক (প্রশাসন) ডিএম সালাউদ্দিন আহমেদ, মিথিলা ফারজানা, অপর্ণা পাল এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের কূটনৈতিক পাসপোর্ট সাধারণ পাসপোর্টে পরিবর্তনের জন্য ফাইল প্রস্তুত করে তা অনুমোদনের জন্য তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনের কাছে উপস্থাপন করেন। পররাষ্ট্র সচিব ফাইলটি তাৎক্ষণিকভাবে অনুমোদন দেন। অর্থাৎ ৮ আগস্ট সন্ধ্যায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেওয়ার আগেই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া এই বিতর্কিত দুই কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের অনুকূলে থাকা ৪টি কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিল করে সাধারণ পাসপোর্ট পাওয়ার যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়।
পররাষ্ট্র সচিবের অনুমোদনের পর কূটনৈতিক পাসপোর্টগুলো বাতিল করার জন্য কনস্যুলার অনুবিভাগকে চূড়ান্ত নির্দেশনা দেওয়া হয়। ওই দিনই অর্থাৎ ৮ আগস্ট সন্ধ্যার আগেই মিথিলা ফারজানা, অপর্ণা পাল এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিলের চিঠি ইস্যু করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই নজিরবিহীন বেআইনি পদক্ষেপের কারণে ফ্যাসিবাদের এই দুই দোসর কানাডায় পালিয়ে থাকতে পেরেছে। কূটনৈতিক পাসপোর্ট নিয়ে কানাডায় থেকে যাওয়ার তাদের কোনো সুযোগ ছিল না।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং কানাডায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের একাধিক কর্মকর্তা আমার দেশকে জানিয়েছেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত কাউন্সেলর পদে কর্মরত এই দুই বিতর্কিত কর্মকর্তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিল করে সাধারণ পাসপোর্ট সরবরাহ করায় তারা কানাডাতে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদনের সুযোগ পায় এবং তাদের সেই আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে অর্থাৎ মিথিলা ফারজানা এবং অর্পণা পাল এখন রাজনৈতিক আশ্রয়ে কানাডায় অবস্থান করছেন।
এ অনিয়মের ব্যাপারে জানতে চাইলে পরররাষ্ট্র সচিব মো. জসিম উদ্দীন আমার দেশকে বলেন, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা খতিয়ে দেখবেন।
উল্লেখ্য, রাজনৈতিক বিবেচনায় কানাডায় বাংলাদেশ মিশনে কাউন্সেলর পদে নিয়োগপ্রাপ্ত মিথিলা ফারজানা এবং অপর্ণা পালের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাতিল করা হয়। ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট এক প্রজ্ঞাপনে তাদের নিয়োগ বাতিল করে ৩১ আগস্টের মধ্যে দেশে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে ১৪ আগস্ট নিয়োগ বাতিলের চিঠি পাওয়ার আগেই মিথিলা ফারজানা এবং অপর্ণা পাল তাদের কর্মস্থল অর্থাৎ কানাডায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে হাইকমিশনের পক্ষ থেকে ঢাকায় হেড কোয়ার্টারে জানানো হয়।
মিথিলা ফারজানা ও অপর্ণা পালের কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিলের আবেদন এবং সেই আবেদন কার্যকর সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপে জানা যায়, বিতর্কিত এই দুই কর্মকর্তা তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিলের আগেই অনুকূলে থাকা কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিলের আবেদন করে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা উৎখাত হয়। ৫ আগস্ট রাতেই মিথিলা ফারজানা এবং তার স্বামী ও ছেলের অনুকূলে থাকা ৩টি এবং অপর্ণা পালের অনুকূলে থাকা ১টি মোট ৪টি কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিলের আবেদন করা হয়। ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের সন্ধ্যায় দায়িত্ব গ্রহণের আগে ওই দিনেই তাদের কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিল করে সাধারণ পাসপোর্ট প্রদানের আদেশ দেয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আমার দেশকে বলেন, কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিলের ওই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ বেআইনি এবং নজিরবিহীন। অত্যন্ত গোপনীয়তার মধ্যে তখন ওই বেআইনি কাজটি করা হয়েছে। একজন সার্ডিং ডিপ্লোম্যাট বা কর্মরত কূটনৈতিকের কূটনৈতিক পাসপোর্ট কখনো বাতিল করা যায় না। এক্ষেত্রে হয় তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিতে হবে অথবা সংশ্লিষ্ট কূটনীতিককে আগে চাকরি থেকে অব্যাহতি নিতে হবে। মিথিলা ফারজানা এবং অপর্ণা পালের ক্ষেত্রে এর কোনোটাই ঘটেনি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আরো জানান, কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিল সংক্রান্ত এই ধরনের ফাইল সাধারণত সহকারী সচিব অথবা সিনিয়র সহকারী সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তারা উত্থাপন করে থাকেন। কিন্তু এক্ষেত্রে নিয়ম ভঙ্গ করে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে তৎকালীন মহাপরিচালক (প্রশাসন) নিজেই ফাইলটি উত্থাপন করেন এবং তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন তাৎক্ষণিকভাবে তা অনুমোদন করেন।
কর্মকর্তারা বলছেন, এই ধরনের তুঘলকি কাণ্ড পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইতিহাসে আগে কখনো ঘটেনি। কেন মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা এই ধরনের বেআইনি কাজে যুক্ত হয়েছিলেন তা রীতিমতো রহস্যের জন্ম দিয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রথমে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি। পরে লিখিত বার্তা পাঠানোর পরও কোনো সাড়া দেননি সাবেক এ কূটনীতিক।
মিথিলা ফারজানা এবং অপর্ণা পালের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পাওয়ার পর বাংলাদেশের কানাডা মিশনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের অব্যাহতি দেওয়া হয়। মিশনের পক্ষ থেকে ইমেইল যোগে অব্যাহতিপত্র পাঠানো হয় বলে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, বিতাড়িত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ একাত্তর টিভির হেড অব কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স মিথিলা ফারজানাকে (মোবাশ্বিরা ফারজানা মিথিলা) ২০২৩ সালের ৮ নভেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে উপসচিব পদমর্যাদায় চুক্তিভিত্তিতে ২ বছর মেয়াদে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনকূটনীতি অনুবিভাগে পরিচালক পদে পদায়ন করা হয়। পরে মিথিলা ফারজানাকে কানাডায় বাংলাদেশ মিশনে কাউন্সেলর হিসেবে পোস্টিং দেওয়া হয়। বাংলাদেশ মিশনে তার দায়িত্ব ছিল বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনের পাশাপাশি বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরা।
অন্যদিকে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অপর্ণা পালকে ২০১১ সালে রাজনৈতিক বিবেচনায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিলের সময়ে তিনিও কানাডায় বাংলাদেশ মিশনে কাউন্সেলর হিসেবে কর্মরত ছিলেন।