জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) লক্ষ্য ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ প্রতিষ্ঠা। এ লক্ষ্যে পৌঁছাতে দেওয়া ঘোষণাপত্রের সঙ্গে সংগতি রেখে তিন ধাপের (স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি) কর্মসূচি ঠিক করছে দলটি। চলতি মাসের মধ্যে কর্মসূচি নির্ধারণ করা হবে।
সেই সঙ্গে চলবে দেশব্যাপী সাংগঠনিক কাঠামো চূড়ান্ত করার কাজ। ঈদুল ফিতরের আগেই নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা এবং ঈদের পর কর্মসূচি নিয়ে রাজনৈতিক মাঠে নামবে দলটি। একাধিক সূত্র এসব তথ্য আমার দেশকে নিশ্চিত করেছে।
সূত্র জানায়, এনসিপির টার্গেট ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ প্রতিষ্ঠা। এতে একাত্তরের সঙ্গে চব্বিশের অঙ্গীকার যুক্ত থাকবে। ’৭২-এর ‘প্রথম রিপাবলিক’ মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য বলা হলেও ব্যর্থ হয়েছে, তার বিপরীতে চব্বিশের ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’-এ স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার কথা থাকছে। এতে একাত্তরের প্রকৃত চেতনা এবং চব্বিশের স্পিরিট সম্পৃক্ত হবে। সেক্ষেত্রে গণপরিষদ নির্বাচন দিয়ে গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়ন করে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রসঙ্গ রয়েছে। ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ প্রতিষ্ঠা হবে ঘোষণাপত্রের সঙ্গে সংগতি রেখে।
সূত্র আরো জানায়, নতুন দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সাংগঠনিক কাঠামো গোছানোর প্রক্রিয়া চলতি মাসেই সম্পন্ন হবে। নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন পেতে ঈদের আগেই পূরণ করা হবে সব শর্ত। এরপর নিবন্ধনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। রজমানের মধ্যেই দলের কর্মসূচি ঘোষণার চিন্তাভাবনা রয়েছে। যা নিয়ে ঈদের পর মাঠে নামবে দলটি।
এ ক্ষেত্রে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি নির্ধারণ করা হবে। স্বল্পটা হবে নির্বাচনকেন্দ্রিক, মধ্যমটা নির্বাচনের পর সরকারে বা বিরোধী দলে গেলে বাস্তবায়নকেন্দ্রিক এবং দীর্ঘটা দলের আগামীর কর্মসূচি নিয়ে। এসব কর্মসূচিতে ঘোষণাপত্রের প্রতিফলন থাকবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার আমার দেশকে বলেন, রোজার মাসে আমরা বড় কর্মসূচির দিকে হয়তো যাব না। মূলত সংগঠন গোছানোর দিকে এ মাসে আমরা মনোনিবেশ করব। ২৬ মার্চে স্বাধীনতা দিবস পালন করা এবং ইফতার পার্টি করা হবে। আর জাতীয় নাগরিক কমিটির কমিটিগুলোর নেতারা রাজনৈতিক দলে আসতে আগ্রহী, তাদের মাইগ্রেশন পলিসিটা কেমন হবে সেটি ঠিক করা হবে। শিগগিরই দলের একটা সভা হবে, সেখানে এসব বিষয়সহ দল গোছানোর অন্য বিষয়গুলোও থাকবে।
সূত্র জানায়, ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার বিলোপ, নতুন বন্দোবস্তের লক্ষ্য নিয়ে আত্মপ্রকাশ ঘটে এনসিপির। ঘোষণা করা হয় ১৫১ সদস্যের আংশিক কেন্দ্রীয় কমিটির। এই কমিটির প্রথম পরিচিতি সভা চলতি সপ্তাহে হচ্ছে। সেই সভায় কেন্দ্রীয় কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা এবং আগামীর কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা ও সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
একই সঙ্গে থানা পর্যন্ত গঠন করা জাতীয় নাগরিক কমিটির কমিটিগুলোর মধ্যে নতুন দলে আসতে আগ্রহীদের মতামত নেওয়া হবে। এর মধ্য থেকে দ্রুত নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন পেতে প্রয়োজনীয় কমিটি চূড়ান্ত করা এবং অফিস নেওয়াসহ শর্তগুলো পূরণ করা হবে। তারপর দেশব্যাপী সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করা হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক কমিটির শীর্ষ একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমার দেশকে বলেন, জাতির ঘাড়ে চেপে বসা ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে গত সাড়ে ১৫ বছরে কেউ হটাতে পারেনি। জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে তার পতন হয়েছে। তিনি বাধ্য হয়েছেন দেশ ছাড়তে। এখন তাকে গণহত্যার জন্য বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
রাষ্ট্রকে ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারী ধারা থেকে মুক্ত রাখতে রাষ্ট্র সংস্কারের মৌলিক দাবি নিয়ে হাজির হয়েছে ছাত্র-জনতা। কিন্তু নির্বাচনমুখী রাজনৈতিক দলগুলো এই ঐকমত্যের দাবি থেকে ক্রমান্বয়ে দূরে সরে যাচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। সেজন্যই জুলাইয়ের জনআকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের স্পিরিটকে ধারণ করে নতুন দলের জন্ম হয়েছে। এই দলের বক্তব্য-বিবৃতি থেকে শুরু করে কর্মসূচি, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, কর্মকৌশল ও পন্থা হবে জুলাই স্পিরিটের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে হবে।
সূত্র জানায়, দল গোছানোর পাশাপাশি ধারাবাহিকভাবে চলবে রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকৌশল প্রণয়নের কাজ। বিশেষ করে জুলাই ঘোষণাপত্র দেওয়ার জোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। ’৭২-এর সংবিধান বাতিল করে গণভোটের মাধ্যমে নতুন সংবিধান করা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলো নিয়ে ধাপে ধাপে এগোবে এনসিপি।
রাজনৈতিক কর্মসূচি নির্ধারণেও এর বড় প্রভাব থাকবে। এর মধ্যে দিয়ে বিদ্যমান রাষ্ট্র কাঠামোর চারিত্রিক মৌলিক পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো সামনে নিয়ে আসবে দলটি। নতুন এ দল জনআকাঙ্ক্ষা এবং নতুন প্রজন্মের অভিপ্রায় নিয়ে রাজনীতির মাঠে নতুন মাত্রা নিয়ে হাজির হবে।
এ বিষয়ে এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সংগঠক এসএম শাহরিয়ার আমার দেশকে বলেন, আমরা নতুন দল গঠনের আগের যে জপির পরিচালনা করেছি, তাতে মানুষের যে মতামত, পরামর্শ এসেছে তা থেকেই দলের নাম থেকে শুরু করে সবকিছু ঠিক হচ্ছে। জনমানুষের সেই মতামত ও প্রস্তাব জুলাই স্পিরিটের সঙ্গে মিলে যায়। তাদের অভিপ্রায় বাস্তবায়নে ’৭২-এর সংবিধান ব্যর্থ হয়েছে বলেই আমরা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ওপর দাঁড়িয়ে আমরা ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছি। সেজন্য গণপরিষদের মাধ্যমে নতুন সংবিধান এবং তার আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চাই আমরা।
এনসিপির আত্মপ্রকাশের পরই আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে ভারত ও পাকিস্তানপন্থি রাজনীতির ঠাঁই হবে না। আমরা বাংলাদেশকে সামনে রেখে, বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থকে সামনে রেখে রাষ্ট্রকে বিনির্মাণ করব।’
নতুন দলের ঘোষণাপত্রে নাহিদ বলেন, আমরা মনে করি, জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার লড়াই সূচনা করেছে। একটি গণতান্ত্রিক নতুন সংবিধান প্রণয়নের মাধ্যমে আমাদের সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সব সম্ভাবনার অবসান ঘটাতে হবে। এতে বলা হয়, আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার জন্য গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন আমাদের অন্যতম প্রাথমিক লক্ষ্য।
আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিকে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। ভেঙে পড়া রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় গড়ে তোলা ও তাদের গণতান্ত্রিক চরিত্র রক্ষা করা হবে আমাদের রাজনীতির অগ্রাধিকার। এর মধ্য দিয়েই কেবল আমরা একটি পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হতে পারব।