গত দেড় দশকে দেশের শেয়ারবাজারে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) রেগুলেশনের নামে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ (ওভার রেগুলেট) করেছে। বাজারে সুশাসনের পরিবর্তে বিশেষ গোষ্ঠীকে কিংবা রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে বিএসইসি মাত্রাতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ করেছে বলে অভিযোগ করেছেন বাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। মাত্রাতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের এ ধারা থেকে বের হয়ে স্টক এক্সচেঞ্জকে সেলফ রেগুলেটরি হিসেবে কাজ করতে দেওয়া উচিত বলে তারা মনে করেন।
গতকাল বুধবার ডিএসই ব্রোকারেজ অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। রাজধানীর নিকুঞ্জে অবস্থিত ডিএসই ভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ডিবিএ প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলামের সঞ্চালনায় এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী। বক্তব্য রাখেনÑ চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহমেদ, ডিবিএ’র সাবেক সভাপতি আহমেদ রশীদ লালী, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকী, বিএনপি নেতা জহির উদ্দিন স্বপন, অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, ব্যাংকার সাবের সিদ্দিক, ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালা, সিএমজেএফ সভাপতি গোলাম সামদানি।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিএসইসি খুবই শক্তিশালী একটি বডি। তাদের কাজে খবরদারি করার কোনো সুযোগ নেই। এমনকি তাদের সরানোর ক্ষমতাও সরকারের নেই। তারা আইন প্রণয়ন করতে পারে। কিন্তু বিগত সময়ে রেগুলেটর রাজনৈতিক পার্টি হিসেবে কাজ করেছে। তারা রেগুলেশনের নামে ওভার রেগুলেট করেছে। এখন আমাদের ডিরেগুলেটেড (নিয়ন্ত্রণ কমানো) করতে হবে। ডিরেগুলেশন না হলে সেলফ রেগুলেশন হবে না। রেগুলেটরের কাজ হচ্ছে ওয়াচডগের ভূমিকা পালন করা। ডে টু ডে কাজের তদারক করার দরকার নেই। স্টক এক্সচেঞ্জকে সেলফ রেগুলেটরি বডি হিসেবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।
সিএসই চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন বলেন, শেয়ারবাজার পরিস্থিতি খুবই নাজুক। এর মধ্যে বাজার ওভার রেগুলেটেড। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ও চিটাগং স্টক এক্সচেঞ্জের স্বাধীনভাবে কার্যক্রম পরিচালনার যে ক্ষমতা, তা ফিরিয়ে দেওয়া উচিত। ওভার রেগুলেশন ও বারংবার নীতি পরিবর্তন বন্ধ করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
ডিবিএ’র সাবেক প্রেসিডেন্ট আহমেদ রশীদ লালী সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন অর্ডিন্যান্স-১৯৬৯-এর ২সিসি ধারার উল্লেখ করে বলেন, এটি একটি সমস্যা। এটি বাদ দেওয়া উচিত। বিএসইসি এই ২সিসি দ্বারা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে কিন্তু বাজারকে রেগুলেট করে না। আগামী জাতীয় সংসদে এটির রিভিউ হওয়া উচিত বলে মত প্রকাশ করেন তিনি। তিনি আরো বলেন, প্রাইামারি রেগুলেটর হিসেবে স্টক এক্সচেঞ্জকে কাজ করতে দিতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা শুধু রেগুলেট করবে বিষয়টি এমন নয়, তাদের ফ্যাসিলেটেটর হিসেবেও কাজ করতে হবে।
ব্যাংকার সাবের সিদ্দিক আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, কোম্পানির লিস্টিংয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কোনো ভূমিকা থাকা উচিত নয়। স্টক এক্সচেঞ্জ শুধু নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে অবহিত করবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এটাই নিয়ম। আমাদের দেশেও এ নিয়ম চালু হওয়া উচিত।
সভায় জানানো হয়, গত ১৬ বছরে অনেক দুর্বল কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দিয়েছে বিএসইসি। এসব কোম্পানির আইপিও নিয়ে ডিএসইর পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হলেও সেগুলো আমলে নেয়নি বিএসইসি। কিন্তু এখন সেসব কোম্পানির অধিকাংশ জেড ক্যাটাগরিতে অবনমিত হয়েছে। শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীরা এসব কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বিনিয়োগকারীর স্বার্থরক্ষা না করে বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষায় দুর্বল কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দিয়েছে আর এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা তার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ করা হয় সভায়।