রাজধানীর কারওয়ান বাজারে টিসিবি ভবনের সামনে গিয়ে দেখা যায় ভর্তুকি মূল্যের পণ্যবাহী ট্রাকের সামনে নারী-পুরুষের দীর্ঘলাইন। লাইনে দীর্ঘসময় অপেক্ষা করেও পণ্য না পেয়ে কয়েকজন নারী উচ্চস্বরে কথা বলছেন।
পাশের লাইনে শতাধিক পুরুষ অপেক্ষা করছেন পণ্য কেনার জন্য। কারো হাতে বস্তাভর্তি পণ্য, আবার কাউকে পণ্য কিনতে না পেরে ফেরত যেতেও দেখা গেছে। এ সময় পাওয়া গেছে, স্বজনপ্রীতি ও ওজনে কম দেওয়ার অভিযোগ।
গতকাল সোমবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এ পরিস্থিতি দেখা যায়।
একটু এগিয়ে গেলে রাশেদা নামের একজন বলেন, ‘আমরা বেলা ১১টা থেকে অপেক্ষা করেও পণ্য পাচ্ছি না, কিন্তু ট্রাকের লোকজন তাদের স্বজনদের বস্তায় করে পণ্য দিয়ে দিচ্ছেন। তাই আমরা এর প্রতিবাদ করছি।’
রাশেদা এসেছেন নাখালপাড়া থেকে। বেলা ১১টা থেকে অপেক্ষা করছেন, কিন্তু বেলা ৩টার দিকেও পণ্য কিনতে পারেননি। তিনি বলেন, ছেলেমেয়ে ও শাশুড়ি নিয়ে পাঁচজনের সংসার। স্বামী বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন। সংসারে অভাব-অনটন, তাই টিসিবির পণ্য নিলে কিছুটা সাশ্রয় হবে। কিন্তু এভাবে অপেক্ষা করে কি পণ্য কেনা যায়? কোনো নিয়মনীতি না থাকায় লাইনে দাঁড়িয়েও পণ্য পাচ্ছি না।
ট্রাকের অন্যপাশে দেখা যায়, রীনা ও সানোয়ারা নামের দুই নারী দাঁড়িয়ে আছেন টিসিবির পণ্যবোঝাই তিনটি বড় চটের ব্যাগ নিয়ে। তারা এসেছেন হাজারীবাগ এলাকা থেকে। তাদের বেশি পণ্য কেনার বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তারা জানান, ট্রাকে তাদের একজন পরিচিত ব্যক্তি রয়েছেন, তাই তারা একটু বেশি সুবিধা পেয়েছেন।
তাদের দেখানো ট্রাকের ওপর অবস্থান করা ব্যক্তিকে স্বজনপ্রীতির বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি নিজের নাম ও পরিচয় দিতে অস্বীকৃতি জানান। তবে দুই নারীকে বেশ কয়েক দফা বেশি পণ্য দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, তাদের স্বামী অসুস্থ, তাই তাদের বেশি পণ্য কেনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
মনোয়ারার আটজনের সংসার, তিনিও নাখালপাড়া থেকে এসেছেন। দীর্ঘ চার ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও বেলা ৩টা পর্যন্ত তিনি পণ্য কিনতে পারেননি। তার অভিযোগ, ট্রাকে যারা পণ্য বিক্রি করছেন, তারা মুখ চিনে বিক্রি করছেন। কেউ বস্তা ভরে নিয়ে যায়, আবার অনেকে সামান্য পণ্যও পাচ্ছে না। প্রকাশ্যেই চলছে এমন অনিয়ম।
কল্পনা নামে এক নারী অভিযোগ করেন, প্রত্যেক পণ্য ওজনে কম দেওয়া হচ্ছে। কিছুক্ষণ আগে পণ্য কিনে মেপে দেখেছেন ওজনে ১০০ গ্রাম করে কম। বিষয়টি ট্রাকের লোকজনদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তারা বলেন, যারা অভিযোগ করছেন, তারা একাধিকবার নিয়ে দোকানে বিক্রি করছেন। তাই বলে কী মাপে কম দেবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে একজন এগিয়ে এসে মাপে কম না দিতে বলেন ওজনকারী ব্যক্তিকে।
তবে মেসার্স মন্টু এন্টারপ্রাইজের মোবাইলে ফোন করা হলে স্বত্বাধিকারীর ছেলে মামনুন বলেন, অসাবধানতাবশত দু-একটি ক্ষেত্রে মাপে কম হতে পারে। কিন্তু আমরা চেষ্টা করছি সঠিক মাপ দেওয়ার জন্য। তবে স্বজনপ্রীতির অভিযোগটি অস্বীকার করেন তিনি। পরে মেসার্স মন্টু এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী ফোন করে এ ধরনের অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।
এ বিষয়ে টিসিবির মুখপাত্র হুমায়ুন কবির বলেন, কোনো ডিলারের বিরুদ্ধে এ ধরনের স্বজনপ্রীতি এবং ওজনে কম দেওয়ার তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কথা হয় কাজীপাড়া থেকে আসা আব্দুস সামাদ, কারওয়ান বাজারের ইসমাঈল, নাখালপাড়া থেকে আসা তাসলিমা ও সালমাসহ আরো অনেকের সঙ্গে। তারা সবাই দীর্ঘসময় লাইনে অপেক্ষা করেন পণ্য কেনার জন্য। তারা জানান, নিয়মনীতি না থাকায় ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের সামনে দীর্ঘলাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পণ্য না পেয়ে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন অনেকেই।
নিম্ন আয়ের লোকেরা এ পণ্য কিনতে পারছেন না, মুহূর্তের মধ্যেই চলে যাচ্ছে সুবিধাবাদী সিন্ডিকেটের হাতে। তবে এ অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি করছে টিসিবি কর্তৃপক্ষ।
এদিকে এক মাস ৯ দিন পর গতকাল থেকে মাহে রমজানকে সামনে রেখে ছোলা, খেজুরসহ পাঁচ পণ্য ভর্তুকি মূল্যে বিক্রি শুরু করেছে সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। ঢাকা ও চট্টগ্রামে এ কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
টিসিবির আঞ্চলিক কার্যালয় ঢাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যুগ্ম পরিচালক (অফিস প্রধান) হুমায়ুন কবির বলেন, সোমবার থেকে টিসিবির ট্রাক সেল শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার খুলনায় বাণিজ্য উপদেষ্টা কার্যক্রমের উদ্বোধন করার কথা রয়েছে।
টিসিবির ট্রাক থেকে একজন ভোক্তা সর্বোচ্চ দুই লিটার ভোজ্যতেল, দুই কেজি মসুর ডাল, এক কেজি চিনি, দুই কেজি ছোলা ও ৫০০ গ্রাম খেজুর কিনতে পারবেন। প্রতি লিটার ভোজ্যতেলের দাম ঠিক করা হয়েছে ১০০ টাকা, প্রতি কেজি মসুর ডাল ৬০ টাকা, চিনি ৭০ টাকা, ছোলা ৬০ টাকা এবং আধা কেজি খেজুর ১৫৫ টাকায় বিক্রি করছে টিসিবি।