শিক্ষার্থীদের নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থীরা। তারা বলছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী শিক্ষার্থীরা রাজনৈতিক দল গঠন করলে সেটি হবে পরিচ্ছন্ন নতুন রাজনৈতিক সূচনা, রাজনীতিতে যোগ হবে নতুন মাত্রা, এতে বাড়বে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। পাশাপাশি নতুন দল রাজনীতির জন্য হবে মাইলফলক।
তারা আরো বলছেন, বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিকল্প রাজনৈতিক চিন্তা জরুরি। নতুন এই দলটি জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশাগুলো পূরণ করে দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।
এ ছাড়া বেশকিছু প্রত্যাশার কথাও জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। এর অন্যতম কয়েকটি হলো— দল হিসেবে আর্থিকভাবে স্বচ্ছ থাকা, ভারতের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া, দেশের স্বার্থে সব চুক্তি জনগণের সামনে উত্থাপন করা, প্রয়োজনে চুক্তির আগে জনমত যাচাই করা ইত্যাদি।
এ বিষয়ে ঢাবির সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বললে নতুন রাজনৈতিক দল সম্পর্কে তারা তাদের ভাবনাগুলো তুলে ধরেন—
ঢাবির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী তাইজুল ইসলাম বলেন, ছাত্রদের নতুন রাজনৈতিক দল গঠন ভালো সিদ্ধান্ত। তারুণ্য ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে যদি তারা পরিচ্ছন্ন রাজনীতি করতে পারে, তবে দেশ ও জাতি উপকৃত হবে।
এ বিষয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সোয়াইব হোসেন বলেন, বিগত দিনগুলোতে দেখে আসা রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমাদের ব্যথিত করে। আমরা চাই নতুন নেতৃত্ব এসে বাংলাদেশকে নতুনভাবে গড়ে তুলবে। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সুজন হোসেন বলেন, রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে সাধারণ জনতার অধিকার প্রতিষ্ঠার যে সুযোগ জুলাই গণঅভ্যুত্থান শিক্ষার্থীদের দিয়েছে, সেখানে আমি নতুন এই রাজনৈতিক দলের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখি।
অর্থনীতি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী অপু আখলাকুর বলেন, তারুণ্যের যে অদম্য শক্তি সেটাকে সাংগঠনিকভাবে কাজে লাগাতে রাজনৈতিক দল ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশের পচাগলা রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে সম্মিলিত চেষ্টা দরকার। আর রাজনীতিতে জবাবদিহিতার জায়গাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নতুন দলটি সেই জায়গায় ভূমিকা রাখবে বলে আশা রাখি।
আরবি বিভাগের শিক্ষার্থী রাশেদ মুসা বলেন, তরুণ নেতৃত্ব ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। যদি নতুন দলটি আদর্শিকভাবে সুসংগঠিত ও ন্যায্য পথে এগোয়, তাহলে এটি দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী ফাতেমা আক্তার বলেন, নতুন রাজনৈতিক দল গঠনকে আমি তরুণ তুর্কি বিপ্লব এবং তাদের সংস্কারের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হিসেবে দেখছি। পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলো গতানুগতিক ধারায় সক্রিয়। এ ধারা থেকে বেরিয়ে এসে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী শিক্ষার্থীরা এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন।
অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী আদিল হোছাইন চৌধুরী শিক্ষার্থীদের নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, নতুন রাজনৈতিক দলটি বিশেষত আর্থিক, পররাষ্ট্র ও যোগ্য নেতৃত্বের দিকে নজর দিলে অন্যসব দলের তুলনায় জনগণের কাছে বেশি প্রাধান্য পাবে। তাছাড়া পুরোনো দলগুলো তাদের কর্মসূচি ও পরিকল্পনার সংস্কার করবে।
ছাত্রদের নতুন দলের উচিত হবে ভারতের হেজেমনির স্পষ্ট বিরোধিতা করা। বাণিজ্য, সামাজিক ও অর্থনৈতিক এবং অন্য সব ক্ষেত্রে উইন উইন সিচুয়েশনে থাকা, দেশের স্বার্থে সব চুক্তি জনগণের সামনে উত্থাপন করা, প্রয়োজনে চুক্তির আগে জনমতের আকাঙ্ক্ষা জানতে চাওয়া এবং দেশে বিদ্যমান অন্যান্য বিদেশি শক্তির সার্বভৌমত্ব ও দেশবিরোধী চক্রান্তের বিরুদ্ধে কঠোরতা অবলম্বন করতে হবে।
পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তে নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব এই মুহূর্তে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে খুবই জরুরি উল্লেখ করে ঢাবির ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী জুলহাস ইসলাম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জুলাই বিপ্লবে নেতৃত্বদানকারী তরুণদের প্রতি সারা দেশের মানুষের আস্থা রয়েছে, দেশের প্রয়োজনে মানুষ নতুন দলকে সাদরে গ্রহণ করবে।
ঢাবির ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের শিক্ষার্থী ইব্রাহীম খলিল বলেন, গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব প্রদানকারীরা দেশের মানুষের আশার প্রতিফলন ঘটিয়েছে। নতুন রাজনৈতিক দল দেশের অধিকাংশ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আল আমিন সরকার আসন্ন রাজনৈতিক দলের ব্যাপারে বেশ আশাবাদী উল্লেখ করে বলেন, আমি মনে করি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি খুবই ইতিবাচক একটি উদাহরণ হতে যাচ্ছে।
বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মোসাদ্দেক আলী ইবনে মুহাম্মদ বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী শক্তি যদি নতুন দল গঠন করে এবং নিজ নিজ নৈতিক শক্তিকে ধরে রাখতে পারে তাহলে মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হবে।
থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী ও সংবাদকর্মী ওবায়দুর রহমান সোহান বলেন, দেশের শিক্ষিত ও সচেতন মানুষের অনেক দিনের আকাঙ্ক্ষা প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে একটি পরিশীলিত রাজনৈতিক দল হবে। তরুণরা তাদের রাজনৈতিক স্পৃহা দেখিয়েছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানে। তারা রাজনীতিতে আসতে চায় কিন্তু তাদের আকাঙ্ক্ষা বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলো পূরণ করতে পারছে না। সেক্ষেত্রে তাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণে এই রাজনৈতিক দল হতে পারে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মাইলফলক।
নৃবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী রিফাত হোসাইন বলেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে তৃতীয় শক্তি গড়ে তোলা কঠিন এবং চ্যালেঞ্জের হবে। তবে বাংলাদেশে প্রচলিত যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি তা থেকে বেরিয়ে আসতে তরুণ নেতৃত্বনির্ভর নতুন রাজনৈতিক দলের আবির্ভাব হবে বলে আশা রাখি। যা এই প্রজন্মের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাবে, পাশাপাশি প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলবে। বিদ্যমান দলগুলোও যুগের চাহিদা অনুযায়ী নিজেদের মধ্যে সংস্কার করতে বাধ্য হবে।
পরিসংখ্যান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রিয়াদুস সালেহীন বলেন, জুলাই বিপ্লবে নেতৃত্ব দানকারীদের বড় অংশই যেহেতু জাতীয় নাগরিক কমিটির সঙ্গে যুক্ত সেহেতু এই রাজনৈতিক দলটি জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করবে বলে আমি মনে করি।
সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী মুক্তারুজ্জামান বলেন, জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক দলের কোনো বিকল্প নেই। অদূর ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের আসন্ন রাজনৈতিক দলটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ উপহার দিতে সক্ষম হবে।
বাংলা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী শিশির ইসলাম বলেন, তরুণ প্রজন্মের রাজনীতিতে যোগদান এই জাতির জন্য নিঃসন্দেহে একটি নতুন মাইলফলক হবে।
ঢাবির থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী মিরহাজুল শিবলী বলেন, গণতান্ত্রিক দেশে ছাত্রদের দল গঠন করার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। শুধু নগরকেন্দ্রিক, সংবাদমাধ্যমনির্ভর দল হলে রাজনীতিতে খুব একটা পরিবর্তন আসবে না। তৃণমূলে শক্ত অবস্থান তৈরির পাশাপাশি ব্যাপক জনসমর্থন এবং গ্রহণযোগ্য নেতা প্রয়োজন নতুন দলে। সেটি তারা কতটা নিশ্চিত করতে পারবে এবং সাধারণ মানুষ সেই নেতৃত্বকে কতটা গ্রহণ করবে সেটিই এখন দেখার বিষয়।