রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় আজ বৃহস্পতিবার চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি। তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে শিয়া মুসলিমদের অন্যতম পবিত্র শহর ইরাকের নাজাফে জড়ো হন লাখো মানুষ। নিজ জন্মস্থান মাশহাদে তাকে কবরস্থ করা হবে।
ইরাকের ঐতিহাসিক কারবালা থেকে ইতোমধ্যে তার লাশ ইরানে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এরপর জানাজার জন্য জন্য ইমাম রেজা মাজার কমপ্লেক্সে আনা হয় তার নিথর দেহ।
সাত দিনব্যাপী আনুষ্ঠানিক শোক ও দাফনপ্রক্রিয়ার তৃতীয় দিন রোববার স্থানীয় সময় সকাল ৮টায় তেহরানে তার প্রথম জানাজা সম্পন্ন হয় । শিয়া ধর্মীয় নেতা জাফর সোবহানি জানাজার নামাজের ইমামতি করেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধের প্রথম দিন মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় ৮৬ বছর বয়সি খামেনি নিহত হন। ১৯৮৯ সাল থেকে তিনি ইরান শাসন করে আসছিলেন। একই হামলায় জাহরার মা এবং খামেনির মেয়ে বুশরা খামেনি এবং খামেনির মাত্র ১৪ মাস বয়সি নাতনি জাহরা মোহাম্মাদি গোলপায়েগানি নিহত হন।
এর আগে গত শুক্রবার তেহরানে আনুষ্ঠানিকভাবে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শোক ও দাফন অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। শুক্রবার তেহরানে বিদেশি নেতাদের বেশির ভাগই খামেনির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
গত শনিবার লাখ লাখ ইরানি খামেনির জানাজার আনুষ্ঠানিকতার দ্বিতীয় দিনের কর্মসূচিতে যোগ দেন।
নিরাপত্তার কারণে ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা ও খামেনির ছেলে মোজতবা আলি খামেনি শোক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারেননি। সম্প্রতি মোজতবাকে হত্যার হুমকি দিয়েছে ইসরাইল।
এর আগে আয়াতুল্লাহ খামেনিকে গত মার্চ মাসে দাফন করার পরিকল্পনা ছিল। তবে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় সেই সূচি পিছিয়ে দেওয়া হয়।
খামেনি ১৯৩৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন। মাশহাদ ইরানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জনবহুল শহর। এখানে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ বাস করেন। শিয়া মুসলিমরা শহরটিকে পবিত্র হিসেবে মনে করেন। শিয়াদের যে শীর্ষ ১২ নেতা আছে তাদের একজন ইমাম রেজা। তার কবর এই মাশহাদে অবস্থিত। শিয়াদের বিশ্বাস হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর উত্তরসূরিদের একজন ইমাম রেজা।
খামেনিকে কবর দেওয়া হবে ইমাম রেজা মাজার কমপ্লেক্সে। ধারণা করা হচ্ছে, খামেনিকে ধর্মীয় নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে তাকে সেখানে দাফন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ইমাম রেজাকে নবম শতকে বিষক্রিয়ার মাধ্যমে হত্যা করা হয় বলে বিশ্বাস। এরপর তাকে মাশহাদে দাফন করা হয়।
খামেনির ছেলে ও বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবার জন্মও হয়েছিল মাশহাদে। এছাড়া সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির জন্ম হয়েছিল শিয়াদের পবিত্র শহরে। ২০২৪ সালে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় নিহত হন ইব্রাহিম রাইসি। এরপর তাকে ইমাম রেজা মাজার কমপ্লেক্সে সমাহিত করা হয়। এক সময় ধারণা করা হতো, ইরানের পরবর্তী সুপ্রিম লিডার হবেন রাইসি। তবে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় আকস্মিক তার মৃত্যু হয়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা নিশ্চিত করেছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় খামেনিকে ইরানের সবচেয়ে পবিত্র উপাসনালয় ‘ইমাম রেজার মাজারে’ সমাহিত করা হবে। খামেনির ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে এখানে দাফন করা হচ্ছে, যেখানে এর আগে সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসিসহ ইরানের বহু ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব সমাহিত হয়েছেন।
ছয় মাস আগের অভ্যন্তরীণ সরকার বিরোধী বিক্ষোভের দমনপীড়ন এবং এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর, এই বিশাল জানাজার মাধ্যমে নিজেদের শক্তি ও জাতীয় ঐক্য প্রদর্শন করতে চাইছে তেহরান। রাজধানী তেহরানে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা, ধর্মীয় শহর কোম এবং প্রতিবেশী ইরাক ঘুরে খামেনির লাশ এখন মাশহাদে। শেষ বিদায়ের এই ক্ষণে খামেনির সঙ্গে একই কবরে সমাহিত করা হবে তার শিশু নাতনি, জামাতা, কন্যা এবং পুত্রবধূ জাহরা হাদ্দাদ আদেলকে।
সূত্র: আল-জাজিরা, রয়টার্স, এএফপি