গত সেপ্টেম্বরে নেপালে ছড়িয়ে পড়া গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের গুলিতে অন্তত ৭০ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিহতদের বেশিরভাগই ছিলেন বিক্ষোভকারী। শুরুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু হলেও, পরে তা দুর্নীতি, শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বিরুদ্ধে জমে থাকা জনরোষে রূপ নেয়।
কাঠমান্ডু উপত্যকা পুলিশের মুখপাত্র ওম অধিকারী সংবাদ সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছেন, আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়নি। জানা গেছে, তদন্ত কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতেই এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করা হয়েছে।
গণঅস্থিরতা তদন্তে গঠিত একটি প্যানেল তাদের প্রতিবেদনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ওলি এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখককে ‘ফৌজদারি অবহেলা’র দায়ে অভিযুক্ত করে বিচারের আওতায় আনার সুপারিশ করে। একই প্রতিবেদনে সাবেক পুলিশ প্রধান চন্দ্র কুবের খাপুংকেও গ্রেপ্তারের সুপারিশ করা হয়। তবে এর আগেই তদন্ত কমিশনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছিলেন ওলি। দেশটির দৈনিক ‘অন্নপূর্ণা পোস্ট’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, এই প্রতিবেদন তার বিরুদ্ধে ‘চরিত্রহনন’ এবং ‘ঘৃণ্য রাজনীতি’র অংশ।
ওলির গ্রেপ্তার এমন এক সময়ে হলো, যখন নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সাবেক র্যাপার বালেন শাহ শপথ নিয়েছেন। নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র একদিনের মাথায় এই উচ্চপর্যায়ের গ্রেপ্তারি অভিযান দেশটির রাজনীতিতে নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। নেপালের বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুং, যিনি নিজেও ওই আন্দোলনের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন, ওলির গ্রেপ্তারকে স্বাগত জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় তিনি লিখেছেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়; এটি কোনো প্রতিশোধ নয়, বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার শুরু।
বিশ্লেষকদের মতে, বালেন শাহর নেতৃত্বাধীন নতুন প্রশাসন এই পদক্ষেপের মাধ্যমে জনগণের কাছে নিজেদের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আইনের শাসনের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরতে চাইছে। ওলির গ্রেপ্তারের পর কাঠমান্ডুসহ নেপালের প্রধান শহরগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। প্রশাসনের আশঙ্কা, তার সমর্থকরা বিক্ষোভ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারেন।
গত সেপ্টেম্বরে উত্তাল সেই দিনগুলোতে সাধারণ মানুষের ওপর পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ তৈরি করেছিল। বিষয়টি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিল। তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, তৎকালীন সরকার পরিস্থিতি শান্ত করার পরিবর্তে শক্তি প্রয়োগের পথ বেছে নেয়, যা শেষ পর্যন্ত বহু প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এখন পুরো নেপালজুড়ে একটাই প্রশ্ন—এই আলোচিত ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার আদৌ নিশ্চিত হবে কি না।