ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশে একটি বড় আকারের নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশন পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। রোববার (১১ জানুয়ারি) ঢাকায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে এক বৈঠকে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান পর্যবেক্ষক ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ইভারস আইজাবস।
বৈঠক শেষে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
প্রেস সচিব বলেন, বৈঠকে নির্বাচন প্রস্তুতি, সমতাভিত্তিক প্রতিযোগিতার পরিবেশ (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড) এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়। ইভারস আইজাবস বৈঠকে উল্লেখ করেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনকে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে দেখছে। সেই কারণেই বড় আকারের পর্যবেক্ষক মিশন পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন অনেক দেশেই নির্বাচন পর্যবেক্ষক পাঠায় না। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের বড় বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব রয়েছে এবং বাংলাদেশকে তারা ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেশ হিসেবে বিবেচনা করে।
শফিকুল আলম বলেন, শেখ হাসিনার প্রায় সাড়ে ১৬ বছরের শাসনামলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন একবারও বাংলাদেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল পাঠায়নি। ইভারস আইজাবসের মতে, আগের তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য ছিল না। তবে এবার নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে ইতিবাচক পরিবেশ ও ব্যাপক উৎসাহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, বৈঠকে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ বা দলটির নির্বাচনে থাকা–না থাকা নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। তবে গণভোট প্রসঙ্গে ইইউ প্রতিনিধি বলেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ও কাঙ্ক্ষিত সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের পথ তৈরি হবে।
প্রেস সচিব আরও জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষক দল দেশের সব অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে। তারা বড় রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি অন্যান্য অংশীজনদের সঙ্গেও মতবিনিময় করবে এবং পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বৈঠকে ইইউ প্রতিনিধিকে আশ্বস্ত করে বলেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হবে অবাধ, সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর। তিনি জানান, নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচন আয়োজনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে এবং সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। তার ভাষায়, “দেশের সর্বত্র এখন নির্বাচনের জোয়ার চলছে।”
নির্বাচনের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বডি-ওর্ন ক্যামেরা থাকবে, যা একটি কেন্দ্রীয় অ্যাপের মাধ্যমে উপজেলা, জেলা, বিভাগ ও ঢাকা থেকে সরাসরি মনিটর করা যাবে। সব ভোটকেন্দ্রে থাকবে সিসিটিভি ক্যামেরা এবং দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী থাকবে র্যাপিড রেসপন্স স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট চাওয়ার বিষয়ে সরকার আইনগত মতামত নিয়েছে জানিয়ে শফিকুল আলম বলেন, শীর্ষ আইন বিশেষজ্ঞরা লিখিতভাবে জানিয়েছেন—এতে কোনো আইনগত বাধা নেই। ফলে সরকার এ বিষয়ে প্রচার ও জনসচেতনতা কার্যক্রম চালাবে।
প্রধান উপদেষ্টা জানান, ২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনি প্রচার শুরু হবে। তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষক মিশন পাঠানো বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের একটি বড় স্বীকৃতি।
তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া তথ্য ও অপপ্রচারকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন অধ্যাপক ইউনূস। তিনি বলেন, পতিত স্বৈরাচারের সমর্থকেরা নির্বাচন বিঘ্নিত করার চেষ্টা করতে পারে, তবে এসব মোকাবিলায় নিরাপত্তা বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
ব্রিফিংয়ে আরও জানানো হয়, নারী ও তরুণদের মধ্যে ভোট নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ফলে এবারের নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য ভোটার উপস্থিতির আশা করছে সরকার।
এই ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদারও উপস্থিত ছিলেন।