স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ঈদের আগে গত ৩০ মার্চ জাতীয় ঈদগাহ ময়দান পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। এ সময় সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল, ঈদে নাশকতার কোনো আশঙ্কা রয়েছে কি না? জবাবে তিনি বলেছিলেন, পবিত্র ঈদুল ফিতর ঘিরে নাশকতার শঙ্কা নেই। শুধু স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাই নয় আইজিপি, ডিএমপি কমিশনার ও র্যাবের মহাপরিচালককেও ঈদের আগের কয়েক দিন একই ধরনের প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে।
এতে ঈদের আগে এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে মানুষ নিজেদের কতটা অনিরাপদ ভেবেছিল, সেটার প্রমাণ মেলে।
কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, এবারের মতো এত নিরাপদ ঈদ বহু বছর দেখেনি দেশবাসী। কিন্তু কী জাদুবলে সেটা সম্ভব হলো সে বিষয়েও গতকাল বুধবার কথা বলেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি বলেন, ঈদে পুলিশ সদস্যরা না ঘুমিয়ে কাজ করেছেন বলেই সাধারণ মানুষ শান্তিতে ঘুমাতে পেরেছে। গতকাল ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় ও ঈদ পুনর্মিলনীর উদ্দেশ্যে রাজধানীর বিভিন্ন থানা পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফাঁকা ঢাকায় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার শঙ্কায় ছিল সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে পুলিশও। প্রতিবছরই ঈদের ছুটিতে রাজধানীতে হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে চুরি, ডাকাতির মতো বড় বড় ঘটনা ঘটে আসছে। এ অবস্থায় খবর পাওয়া যায়, ভারতের কলকাতায় একটি ইফতার পার্টিতে আওয়ামী লীগের সদস্যরা দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করার পাঁয়তারা করছে। এ ছাড়া রোজা শুরুর আগে রাজধানীসহ সারা দেশে ছিনতাই, চুরি ও ডাকাতির হিড়িক পড়ে যায়।
যে কারণেই এবারের ঈদে ছিল নিরাপত্তা আতঙ্ক। বিশেষ করে রাজধানীতে ঈদের ছুটিতে নানা ধরনের অপরাধের সম্মুখীন হওয়ার কারণে নগরবাসীর মাঝে বেশি আতঙ্ক ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আতঙ্কের মাঝেই সবচেয়ে নিরাপদ ঈদ দেখল রাজধানীবাসী। নিরাপত্তার পাশাপাশি এবারের ঈদুল ফিতরে ছিল না মোড়ে মোড়ে, অলি-গলিতে কান ঝালাপালা করা গানবাজনাসহ তরুণ-তরুণীদের উচ্ছৃঙ্খল আচরণও। ফলে এবারের ঈদকে নিরাপদ বলেই উল্লেখ করেছেন সাধারণ মানুষ।
এ ছাড়া রমজান মাসেও ছিল না দ্রব্যমূল্যের জন্য হাহাকার, ঈদের কেনাকাটায় ছিল স্বস্তি, সড়কে ঘরমুখো লাখো মানুষের যাত্রাও ছিল নিরাপদ, ঈদের দিনও কেটেছে আনন্দ-উত্সবে। নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সব মিলে এবার অন্যরকম এক স্বস্তির ঈদ পার করছে দেশবাসী।
নিরাপদ ঈদ উদযাপন করে অনেক দিন পর পুলিশের প্রশংসা করছে নগরবাসী। গণ-অভ্যুত্থানের পর এই প্রশংসা পুলিশের মনোবল বাড়াতে টনিকের মতো কাজ করবে বলেও মনে করছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন বিভাগের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার ডিআইজি এস এন মো. নজরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এবারের ঈদে পুলিশকে ছুটি কম দেওয়া হয়েছে। রাজধানীতে দায়িত্ব পালনকারী প্রত্যেক পুলিশ সদস্য আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। স্টেশনগুলোতে এক্সট্রা ফোর্স দেওয়া হয়েছিল। একটা টিমওয়ার্ক করা হয়েছিল এবারের ঈদে। ফলে নগরবাসীকে নিরাপদ রাখা সম্ভব হয়েছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা যেটা অর্জন করেছি তা হলো মানুষের ভালোবাসা। এর যাতে অবনতি না হয় সে চেষ্টা করে যাব। পুলিশের মনোবল আগের চেয়ে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করছে। নিরাপত্তা পাওয়ায় সাধারণ মানুষ পুলিশের প্রশংসা করছে, যা জেনে খুব ভালো লাগছে।’
এবারের ঈদে সড়ক, রেলপথ এবং নৌপথে যাত্রায় অনেক স্বস্তি ছিল। দীর্ঘ ছুটিতে পর্যায়ক্রমে মানুষের বাড়ি ফেরা, বৃষ্টি না থাকায় সড়কে যান চলাচল ঠিক থাকার মতো বিষয়গুলো ঈদ যাত্রায় স্বস্তি দিয়েছে বলে পুলিশ মনে করে। কোথাও কোথাও সেনাবাহিনীর সদস্যরা সড়কের শৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করায় আরো বেশি স্বস্তি মিলেছে সড়কে। এ ছাড়া এবারের ঈদ যাত্রায় ট্রেন নিয়েও বিড়ম্বনায় পড়তে হয়নি যাত্রীদের। প্রতিটি ট্রেন সময়মতো ছেড়ে যাওয়ায় সংকট তৈরি হয়নি বলেও জানায় পুলিশ।