যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে আবারও সর্বাত্মক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত মাসে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) আর মানবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে দুই দেশই। যুক্তরাষ্ট্র টানা সাত দিন ধরে ইরানে হামলা চালাচ্ছে। এর জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে পাল্টা আঘাত হানছে ইরান।
চুক্তি লঙ্ঘন ও সর্বাত্মক যুদ্ধের হুঁশিয়ারি
গত ১৭ জুন স্থায়ীভাবে সংঘাত বন্ধ ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে এমওইউ সই করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। চুক্তি অনুযায়ী, ২২ জুন সুইজারল্যান্ডে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই দেশের বৈঠকও হয়। কিন্তু এরপরই নতুন করে হামলা শুরু হয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন আর ওই চুক্তির শর্ত মানবে না। গতকাল শনিবার ইরানও চুক্তি থেকে সরে আসার কথা জানিয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এক বিবৃতিতে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বারবার চুক্তির শর্ত ভাঙছে। এতে প্রমাণ হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর ‘মূল্যহীন ও অকার্যকর’।
এদিকে, ইরানের জ্যেষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আরো দু-তিন দিন এমন হামলা চালালে তেহরান ‘সর্বাত্মক অভিযান’ শুরু করবে। ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদিও জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করায় তেহরান চুক্তির সব অঙ্গীকার স্থগিত করেছে।
বেসামরিক স্থাপনায় মার্কিন হামলা
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগেই ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, শুক্রবার রাতে তারা ইরানের নজরদারি ব্যবস্থা, ভূগর্ভস্থ অস্ত্রভান্ডার ও নৌ স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।
তবে ইরান দাবি করেছে, সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি বিমানবন্দর, রেলস্টেশন ও সেতুর মতো বেসামরিক অবকাঠামোতেও হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ৬ জুলাই থেকে শুরু হওয়া নতুন এই সংঘাতে মার্কিন হামলায় অন্তত ৫০ জন নিহত এবং ৫০০-এর বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
খুজেস্তান প্রদেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত ১০ দিনে ১২টি শহরের ৯৫টি স্থানে হামলা হয়েছে। এতে ৮ জন নিহত হয়েছেন। বিদ্যুৎ ও পানি শোধনাগারে হামলার কারণে দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি গ্রামের সুপেয় পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে, হরমোজগান প্রদেশে মার্কিন হামলায় ৩ জন নিহত ও ৮ জন আহত হয়েছেন। সেখানে ১১৬টি টেলিযোগাযোগ টাওয়ার অচল হয়ে পড়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোয় ইরানের পাল্টা জবাব
মার্কিন হামলার জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থানগুলোতে হামলা শুরু করেছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা কুয়েতের একটি তেল স্থাপনা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে। ফলে কুয়েতের কয়েকটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট বন্ধ করে দিতে হয়েছে।
এছাড়া বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত শেখ ইসা বিমানঘাঁটি, জ্বালানি সংরক্ষণাগার ও সেতুতে হামলা চালিয়েছে ইরান। জর্ডানের আল-আজরাক ঘাঁটির জ্বালানি ট্যাংক লক্ষ্য করেও আঘাত হানা হয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, প্রায় তিন মাস পর শুক্রবার রাতে প্রথমবারের মতো সৌদি আরবেও হামলা চালিয়েছে ইরান। রিয়াদের কাছে আল-খারজে প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি এবং ইয়ানবু এলাকায় সতর্কসংকেত বেজেছে। জানা গেছে, আল-খারজের ওই ঘাঁটিতে মার্কিন সেনারা অবস্থান করছেন।
জর্ডানে মার্কিন সেনা নিহত
মার্কিন সেন্টকম জানিয়েছে, শুক্রবার জর্ডানে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকাতে গিয়ে দুই মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় নিখোঁজ আছেন অপর এক সেনা।
আল-জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা শুরুর পর প্রথমে ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হন। পরে বিমান দুর্ঘটনায় এক পাইলট মারা যান। এবার জর্ডানে ২ জনসহ মোট নিহত মার্কিন সেনার সংখ্যা দাঁড়াল ১৬।
ছড়িয়ে পড়ছে সংঘাত
পাল্টাপাল্টি এই হামলা এখন বিস্তৃত যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে। তিন মাসের মধ্যে এই প্রথম সৌদি আরবে হামলা হলো। প্রথমবারের মতো সিরিয়াতেও হামলার খবর পাওয়া গেছে।
কাতারভিত্তিক আরব পারস্পেকটিভস ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক জেইদন আলকিনানি বলেন, যুদ্ধের এই মোড় নেওয়াটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এটি ধীরে ধীরে বড় সংঘাতে রূপ নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইনের কোনো কার্যকারিতা না থাকা এবং যুদ্ধ বন্ধে জাতিসংঘের কোনো উদ্যোগ না থাকাকে তিনি সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ বলে উল্লেখ করেছেন।
সূত্র: রয়টার্স, এএফপি