বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৩৭ অপরাহ্ন

দেশজুড়ে ঝড়-বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢলে পানির নিচে কৃষকের স্বপ্ন

  • সময়: বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬, ৮.৫১ এএম
  • ১৪ জন
সংগ্রহীত ছবি

ধার করা টাকায় বীজ কিনেছিলেন। রোদে পুড়ে, কাদায় মেখে মাসের পর মাস পরিশ্রম করেছিলেন। ধান পেকে সোনার রং ধরেছিল মাঠে। আর কটা দিন-তারপরই ঘরে উঠত ফসল, শোধ হতো ঋণ, চলত সংসার। কিন্তু তার আগেই যেন আকাশ ভেঙে পড়ল কৃষকের মাথায়। পাহাড়ি ঢল নামল উজান থেকে। চোখের সামনে তলিয়ে গেল সারা বছরের স্বপ্ন। হাওড় পারের কৃষক এখন শুধু তাকিয়ে আছেন পানির দিকে-যেখানে কয়েকদিন আগেও ছিল সোনালি ধানের মাঠ।

টানা বৃষ্টি, উজানের ঢল আর নদীর উপচে পড়া পানিতে এবার একসঙ্গে বিপর্যস্ত হয়েছে দেশের বিস্তীর্ণ কৃষি অঞ্চল। নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার থেকে শুরু করে উত্তরের রংপুর, দিনাজপুরসহ দেশের প্রায় সর্বত্রই একই হাহাকার। এছাড়া কালবৈশাখীতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। বৈদ্যুতিক খুঁটি উপড়ে গেছে, ছিঁড়েছে তার। এতে কয়েকটি স্থানে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ৯ জেলায় বজ পাত ও দেওয়াল চাপায় ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে।

 

টানা বর্ষণে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। পাঁচ জেলায় বন্যা হতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। জেলাগুলো হলো-নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, সিলেট ও মৌলভীবাজার। নেত্রকোনার ভুগাই-কংস নদী জারিয়াজাগুইল পয়েন্টে, সোমেশ্বরী নদী কমলাকান্দা পয়েন্টে, মগরা নদী নেত্রকোনা পয়েন্টে ও মৌলভীবাজারের মনু নদী মৌলভীবাজার পয়েন্টে বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদী উত্তাল থাকায় বুধবার লক্ষ্মীপুর-ভোলা নৌ রুটের ফেরি চলাচল বন্ধ রেখেছে কর্তৃপক্ষ।

 

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সারা দেশে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। ৩ মে পর্যন্ত ঢাকাসহ দেশের সব বিভাগেই মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। সারা দেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।

 

নেত্রকোনা, কলমাকান্দা ও দুর্গাপুর : গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় মৌসুমের সর্বোচ্চ ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর সঙ্গে উজানের ঢল মিলিয়ে হাওড় ও নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। ফলে অনেক জায়গায় পাকা ধান পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে, আর যেগুলো কাটা হয়েছে সেগুলোও শুকাতে না পেরে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। খালিয়াজুরী উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, এখন পর্যন্ত হাওড়ের প্রায় ৫৮ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। বাকি ধান এখনো মাঠে রয়েছে, যা পুরোপুরি আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করছে।

 

মোহনগঞ্জ উপজেলার গাগলাজুর এলাকার কৃষক মানিক সরকার বলেন, সোমবারও জমিতে পাকা ধান ছিল। রাতের বৃষ্টিতে সকালে এসে দেখি সব পানির নিচে। সাত বিঘার মধ্যে মাত্র এক বিঘার ধান তুলতে পেরেছি। কৃষ্ণপুর গ্রামের কৃষক শাহিন মিয়া বলেন, সকালে উঠে দেখি খলায় রাখা ধান পানিতে ভেসে গেছে। এখন কী করব বুঝতে পারছি না। হাওড়ের ফসল রক্ষা বাঁধগুলোও এখন চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। মোহনগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন হাওড়ে বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ পাহারা দিচ্ছেন।

 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাদির হোসেন শামীম বলেন, সব প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিকে (পিআইসি) বাঁধ পাহারার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে দ্রুত জিও ব্যাগ ফেলার প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে।

 

কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম মিকাইল ইসলাম বলেন, হাওড়ের ধান কাটাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদীতে পানি বাড়তে শুরু করেছে। উপজেলা কৃষি দপ্তর থেকে কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

 

হবিগঞ্জ : বানিয়াচং উপজেলার সুবিদপুর গ্রামের বাসিন্দা এসএম সুরুজ আলী জানান, আর কয়েকদিন থাকলে এসব ধানে পচন ধরতে পারে। কিন্তু ধান কাটার জন্য শ্রমিকও পাচ্ছেন না। কোনো উপায় না পেয়ে তিনি নিজেই বুধবার সকাল থেকে নিজের ছেলেকে নিয়ে ধান কাটতে শুরু করেছেন। তিনি বলেন, ধানের দামও নেই। কেউ কিনতেও চায় না। এবার লাভ তো নয়ই, লোকসান গুনেও কুলানো যাবে না।

 

ধানের পাইকারি ব্যবসায়ী হামিদুল হক আখঞ্জী জানান, ধানের সরকারি মূল্য নির্ধারণ না হওয়ায় ধান ক্রয় করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, বেশি দামে যদি ধান ক্রয় করি আর সরকার পরে দাম কমিয়ে নির্ধারণ করে তবে তো লোকসানে বিক্রি করতে হবে। তাই আপাতত পর্যাপ্ত পরিমাণ ধান ক্রয় করতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা।

 

অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) কৃষিবিদ দীপক কুমার পাল বলেন, বুধবার পর্যন্ত জেলায় ২৭১০ হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। আমরা কৃষকদের বলছি দ্রুত ধান কাটতে, কিন্তু বাস্তবতা হলো ধান কেটে তারা কোথায় রাখবে। বৃষ্টির কারণে তো শুকাতে পারবে না। আর না শুকাতে পারলে তো ধান পচে যাবে। তাই ধান কাটায় তাদেরও আগ্রহ কম। তিনি বলেন, পানির কারণে হারভেস্টার মেশিন হাওড়ে নামানো যাচ্ছে না।

 

মৌলভীবাজার ও বড়লেখা : রাজনগরের কাউয়াদীঘি হাওড়ের অর্ধেকেরও বেশি পাকা ও আধা-পাকা বোরো ধান তলিয়ে গেছে। কৃষকদের অভিযোগ, কাশিমপুর পাম্প হাউজের গাফিলতি ও সেচ পাম্পগুলো নিয়মিত সচল না রাখায় এমন অবস্থা হয়েছে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড বারবার বলে আসছে তারা নিয়মিত সেচ দিচ্ছে। এদিকে শ্রমিক সংকট, বৃষ্টিতে পানি বাড়ার পাশাপাশি বজ পাতের ভয়ে মাঠে ধান কাটতে নামতে পারছেন না কৃষকরা। এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তারা। এবার রাজনগর উপজেলায় ১৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। এর মধ্যে কাউয়াদীঘি হাওড়ে ৬ হাজার ২৩৭ হেক্টর রয়েছে। রক্তা গ্রামের কৃষক তজমুল আলী বলেন, ১ হাজার, ১২শ টাকা দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। হাওড়ের উলাউলি, কাটারি, বদিরবাড়া, মাঝের ছাউলিয়া, কুশুয়া, মাছুরমুখ গিরিমসহ হাওড়ের বেশ কয়েকটি বিলের পাকা ধান একেবারে তলিয়ে গেছে।

 

বড়লেখা উপজেলা কৃষি অফিসার মনোয়ার হোসেন জানান, হাকালুকি পারের প্রায় ৯০ ভাগ বোরো ধান কাটা শেষ হয়েছে।

 

সুনামগঞ্জ ও ছাতক : মধ্যনগরে আরেকটি বাঁধ ভেঙে গেছে। সেই ভাঙন দিয়ে ঢুকে পড়া পানিতে তলিয়ে গেছে জিনারিয়া হাওড়ের বিস্তীর্ণ বোরো খেত। মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেছে অর্ধশতাধিক কৃষকের সারা বছরের স্বপ্ন। বৃহস্পতিবার সকালে বোলাই নদীর পাশের একটি খালের বাঁধ ভেঙে উক্ত হাওড়ের ফসলহানি ঘটে। এর আগে বুধবার উপজেলার এরন বিল হাওড়ে (ইকরাছই হাওড়ে) বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে। কৃষকরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে তারা নিজ গ্রাম ছেড়ে এখানে অস্থায়ী বসতি গড়ে ফসল ফলিয়ে আসছেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে দিন-রাত পরিশ্রম করেছেন ভালো ফলনের আশায়। কিন্তু বাঁধ ভাঙনের পর সবকিছুই পানিতে ভেসে গেছে। স্থানীয়রা জানান, এই হাওড়ে ২৬ হেক্টর জমি চাষ করা হয়েছিল। ধান পাকা শুরু হলে কিছু ধান কাটা হয়। জিনারিয়া হাওড় পারের কৃষক নিকেশ সরকার বলেন, ধারদেনা করে জমি চাষ করেছি। ধান পাকাই ছিল, কিন্তু আবহাওয়া খারাপ থাকায় কাটতে পারিনি। বাঁধ ভেঙে আমার ২০ কাঠা জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এখন পরিবার নিয়ে কীভাবে চলব বুঝতে পারছি না।

 

ছাতক উপজেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের অবহেলায় ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে ২১ গ্রামের কৃষকের স্বপ্ন। কৃষকদের অভিযোগ, ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর ছাতকের তৎকালীন ইউএনও এবং ২০২৬ সালের ২৩ জানুয়ারি সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কাছে তারা লিখিত আবেদন করেছিলেন। কিন্তু কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

 

কিশোরগঞ্জ ও পাকুন্দিয়া : জেলার ১৩ উপজেলায় কৃষকের সোনার ফসল ডুবে গেছে। মিঠামইনের ঘাগড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান বনেদি কৃষক বোরহান উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বুলবুল জানান, এ অঞ্চলের চাষিদের পরিবারগুলো বোরো ফসলকে জীবিকা করে থাকেন। কিন্তু এবার বাম্পার ফলন হলেও ফসল ঘরে তোলার আগেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

 

বকশীগঞ্জ (জামালপুর) : বকশীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম জানান, প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, গারো পাহাড়ের পাদদেশে কামালপুর, বাট্রাজোড় ও বগারচর ইউনিয়নে ৩৫ হেক্টর পাকা ধান খেত পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এছাড়া ৩০ হেক্টর ভুট্টা হেলে পানিতে আক্রান্ত হয়েছে। কৃষি অফিস ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা দিতে তালিকা করা হচ্ছে।

 

বিভিন্ন স্থানে ঝড়-বৃষ্টিতে ক্ষতি : সাগর উত্তাল থাকায় পায়রা সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত বহাল রেখেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। কালবৈশাখী ঝড়ের কারণে লক্ষ্মীপুরে মেঘনা নদী উত্তাল হয়ে রয়েছে। দুর্ঘটনা এড়াতে বুধবার লক্ষ্মীপুর-ভোলা নৌ রুটের ফেরি চলাচল বন্ধ রেখেছে কর্তৃপক্ষ। এছাড়া ছোট লঞ্চ ও ছোট নৌযানও বন্ধ রাখা হয়েছে। চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের রাঙ্গুনিয়া অংশের ৫টি স্থানে গাছের গোড়া উপড়ে ও গাছ ভেঙে পড়ে প্রায় ৪ ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল। পরে ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা গাছ সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করেন। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের শিবরাম রাঙ্গাতিপাড়া গ্রামের খোকন আলী বলেন, গাছ ভেঙে টিনের চালের ওপর পড়ে, সবকিছু তছনছ হয়ে গেছে। আমরা গরিব মানুষ-কি দিয়ে টিন কিনে চাল ঠিক করব? ময়মনসিংহের গৌরীপুরে স্কুলভবনসহ অর্ধশত বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। মাওহা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবু সালেহ নূর আহম্মদ আকন্দ জানান, বিদ্যালয়ের ৩টি শ্রেণিকক্ষ ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় টানা প্রায় ৩০ ঘণ্টা ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইল নেটওয়ার্কও কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। খাগড়াছড়ির আম ঝরে পড়ে কৃষকের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় ২৬টি খুঁটি বিধ্বস্ত ও ৩৫০ স্থানে তার ছিঁড়ে বিদ্যুৎ বিপর্যয় হয়েছে।

 

এছাড়াও রংপুর, ময়মনসিংহের গৌরীপুর, ধোবাউড়া ও ঈশ্বরগঞ্জ, চট্টগ্রামের মীরসরাই, কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া, লক্ষ্মীপুরের রায়পুর, চাঁদপুর ও শেরপুরে ঝড়-বৃষ্টিতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

 

সূত্র: যুগান্তর

আপনার সামাজিক মাধ্যমে খবরগুলো শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও খবর পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2026 © All rights reserved by BUD News 24