সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চীন সফরের সূচি এখন চূড়ান্ত। আগামী ২৬ মার্চ প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর পাঠানো বিশেষ বিমানে চেপে চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে চীনে যাবেন প্রধান উপদেষ্টা। ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে লালগালিচায় বরণ করতে অপেক্ষায় রয়েছে বেইজিং।
জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে শেখ হাসিনার উৎখাতের পর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের অযাচিত হস্তক্ষেপ এবং ইউনূস সরকারের প্রতি চরম বৈরী আচরণের কারণে ঢাকা-দিল্লির দূরত্ব বেড়েই চলেছে। আর এর দূরত্ব কমানোর জন্য যখন পর্দার আড়ালে তৎপরতা চালাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ঠিক সেই মুহূর্তে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আসন্ন চীন সফর ভূরাজনৈতিক দিক থেকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
আসন্ন এই সফরের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের এক নতুন ভিত্তি রচনা করতে চাইছে দুই দেশ। এ ব্যাপারে আমার দেশ-এর সঙ্গে আলাপে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেছেন, এই সফরের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমরা নতুন একটি ফাউন্ডেশন গড়ে যেতে চাই। আর এর ওপর ভিত্তি করেই আগামীদিনে পথ চলবে দুই দেশ।
ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন আমার দেশকে বলেছেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আসন্ন সফরকে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। আশা করছি এই সফর দু’দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন মাইলফলক হয়ে থাকবে। কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তিতে এই সফর দু’দেশের জনগণের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে।
ভূরাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আসন্ন চীন সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ, স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা, তিস্তা প্রকল্পসহ পানি ব্যবস্থাপনা, সামরিক সহযোগিতা, শিক্ষা খাতে সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি আসতে পারে। তবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আসন্ন চীন সফরের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব সবকিছুকে ছাপিয়ে যাবে।
তিস্তা প্রকল্প বা তিস্তার পানি ব্যবস্থাপনা শুধুমাত্র একটি কারিগরি বিষয় নয়, এখানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি আঞ্চলিক ভূরাজনীতির বিষয়টি সরাসরি যুক্ত। এক্ষেত্রে আসন্ন সফরে কোনো অগ্রগতি হলে তা হবে বাংলাদেশের জন্য একটি কৌশলগত অর্জন।
স্বাস্থ্য খাতে চীনের সহযোগিতার বিষয়টিও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। শেখ হাসিনার পতনের পর ভারত যখন বাংলাদেশিদের ভিসা প্রদান একেবারেই সীমিত করেছে, ঠিক তখনই এগিয়ে এসেছে চীন। বাংলাদেশে একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণসহ ইতোমধ্যে চীনের কুনমিংয়ে বাংলাদেশি রোগীদের জন্য অন্তত চারটি হাসপাতাল নির্দিষ্ট করে দিয়েছে চীন সরকার। সম্প্রতি বাংলাদেশি চিকিৎসক ও রোগীদের একটি প্রতিনিধিদল কুনমিং সফর করেছে। আগামী মাসে একটি চীনা প্রতিনিধি দল আসছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশি রোগীদের জন্য ভারতের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে চীনকে। স্বাস্থ্য খাতে এ সহযোগিতার বিষয়টিও কৌশলগত পদক্ষেপেরই অংশ।
উল্লেখ্য, বিগত ১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিল চীন। তবে ২০২৪ সালে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি হয়। এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায় শেখ হাসিনার বেইজিং সফরের সময়। ওই সফরের সূচি পরিবর্তন করে একদিন আগেই একেবারে শূন্যহাতে দেশে ফিরে আসেন শেখ হাসিনা।
এরপর জুলাই বিপ্লবে উৎখাত হয়ে ভারতে পালিয়ে যান তিনি। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বাংলাদেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কালবিলম্ব না করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করে চীন।
ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনসহ সরকারের অন্যান্য নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে বিএনপি, জামায়াতসহ প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে একের পর এক বৈঠক করেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে যাওয়া হয় বেইজিং সফরে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেন। ২৫ আগস্ট চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করে তার সরকারের পক্ষ থেকে চীন সফরের আমন্ত্রণ পৌঁছে দেন।
এরপর থেকে শুরু হয় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চীন সফর নিয়ে আলোচনা। প্রাথমিকভাবে এই সফর নিয়ে ইতিবাচক সাড়া দেওয়া হয় অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে। নভেম্বরে নির্বাচনের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতার পালাবদলের ফলে এই সফর নিয়ে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। দীর্ঘ আলোচনা এবং কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশের পর চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়ে বলা হয়, আগামী ২৬ মার্চ চীন সফরে যাবেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
প্রধান উপদেষ্টার চীন সফরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর থেকে ভারতসহ বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যমে প্রতিনিয়ত শিরোনাম হচ্ছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আসন্ন চীন সফর। ভারতীয় গণমাধ্যমে এই সফরকে নেতিবাচক হিসেবে তুলে ধরে বলা হচ্ছে। এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ চীনের আরো কাছাকাছি যাবে, যা ভারতের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ। তবে মধ্যপ্রাচ্য, মিয়ানমার, থাইল্যান্ডসহ অন্যান্য দেশের গণমাধ্যমে এই সফরের ভূরাজনৈতিক গুরুত্বকে বিশেষভাবে তুলে ধরা হচ্ছে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আসন্ন চীন সফর নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে বেইজিংয়ে লালগালিচায় বরণ করা হবে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ড. ইউনূসের বৈঠকের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি কূটনৈতিক স্বীকৃতিটা হবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, দায়িত্ব নেওয়ার পর ড. ইউনূসের এটিই প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফর।
এই সফর এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন শেখ হাসিনা এবং তার সহযোগীদের ভারতে আশ্রয় দেওয়ার ফলে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছে। দু’দেশের সীমান্তে চলছে উত্তেজনা। কথিত সংখ্যালঘু নির্যাতন ইস্যুতে ভারতের বয়ানের সঙ্গে মার্কিন জাতীয় গোয়েন্দাপ্রধান তুলসী গ্যাবার্ড দিল্লিতে বসে যখন সুর মিলিয়েছেন, তখন ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে আরো উত্তেজনা বেড়েছে।
চীনের কূটনৈতিক সমর্থনের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার আগামী সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে। এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগ পর্যন্ত চীনের অব্যাহত কূটনৈতিক সমর্থন ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আসন্ন চীন সফর এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের বিষয়ে জানতে চাইলে বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. আতাউর রহমান আমার দেশকে বলেন, ভূরাজনীতি এখন দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে বাংলাদেশকে এখন চীনের দিকে ঝুঁকতে হবে। এটাই এখনকার বাস্তবতা। তিনি বলেন, চীন এখন উদীয়মান পরাশক্তি। নিকট প্রতিবেশী হিসেবে চীনকে আমাদের পাশে প্রয়োজন। এ ছাড়া ভারত কখনো আমাদের বিশ্বস্ত প্রতিবেশী হতে পারেনি। এ সবকিছু বিবেচনায় চীনের দিকেই আমাদের যেতে হবে।
চীন এখন বাংলাদেশের সঙ্গে বহুমাত্রিক অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে চায়। সম্প্রতি চীন সফরের সময় ইউনান একাডেমি অব সোশ্যাল সায়েন্সেস-এর ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ-এর পরিচালক প্রফেসর হং মেই এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপে এ প্রসঙ্গে বলেন, আমরা এখন আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পালন করছি।
এই পর্যায়ে এসে আমরা আমাদের অংশীদারত্ব শুধুমাত্র বিনিয়োগ আর ব্যবসা-বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারি না। উন্নয়ন থেকে শুরু করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, আঞ্চলিক যোগাযোগ, ব্লু ইকোনমি, সমুদ্র নিরাপত্তা, ভূরাজনীতিসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে ঢাকার সঙ্গে অংশীদারত্ব চায় বেইজিং। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে দু’দেশের থিঙ্কট্যাঙ্ক এবং গবেষকদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি ও যৌথ গবেষণার ওপর বিশেষ জোর দেন প্রফেসর হং।
প্রধান উপদেষ্টার আসন্ন চীন সফর এবং এই সফর থেকে বাংলাদেশের অর্জন সম্পর্কে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন আমার দেশকে বলেন, এই মুহূর্তে বিস্তারিত কিছু বলতে চাই না। অনেক কিছু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই সফরের মাধ্যমে আমরা দু’দেশের সম্পর্কের একটি নতুন ফাউন্ডেশন গড়ে যেতে চাই, যার ওপর ভিত্তি করে আগামীতে পথ চলবে দুই দেশ। এই সফরে সুনির্দিষ্ট কোনো চুক্তি হবে না। তবে বেশকিছু বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সই হবে বলে জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।
একই প্রশ্নের জবাবে ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন আমার দেশকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের এটিই প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফর। আমরা এখন আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পালন করছি। আসন্ন সফরকে সফল ও ফলপ্রসূ করতে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। আমরা দুই দেশ এটা নিয়ে একযোগে কাজ করছি। অপেক্ষা করুন, বড় ঘোষণা আসতে পারে এই সফরের মাধ্যমে।
চীনা রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশকে বিশ্বস্ত বন্ধু আখ্যা দিয়ে আরো বলেন, চীন ও বাংলাদেশ সবচেয়ে ভালো বন্ধু ও বিশ্বস্ত অংশীদার। সুতরাং আন্তর্জাতিক বা অভ্যন্তরীণভাবে বাংলাদেশে কোনো পরিবর্তন এলেও আমাদের নীতি অপরিবর্তিত থাকে। বাংলাদেশে যারাই সরকার গঠন করুক না কেন, তাদের সঙ্গেই কাজ করব আমরা এবং আমাদের নীতির কোনো পরিবর্তন হবে না।
এদিকে প্রধান উপদেষ্টার আসন্ন চীন সফরের কর্মসূচি সম্পর্কে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস হাইনান প্রদেশে বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া সম্মেলনে যোগ দিতে ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান শেষে চীনের উদ্দেশে রওনা হবেন।
২৭ মার্চ তিনি সম্মেলনের উদ্বোধন ও পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে ভাষণ দেবেন এবং চীনের নির্বাহী ভাইস প্রিমিয়ার ডিং জুয়েশিয়াং-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। ২৮ মার্চ প্রধান উপদেষ্টা বেইজিংয়ের গ্রেট হল অফ দ্য পিপলে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসবেন। হুয়াওয়ের একটি উচ্চ প্রযুক্তির উদ্যোগ পরিদর্শন ও চীনের শীর্ষস্থানীয় একটি সংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধান উপদেষ্টার। ২৯ মার্চ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করবে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়। তিনি সেখানে ছাত্র-শিক্ষকদের উদ্দেশে বক্তৃতা দেবেন এবং ওই দিনই প্রধান উপদেষ্টার দেশে ফেরার কথা রয়েছে।