বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ০৮:৩৫ অপরাহ্ন

আজ ভয়াল কালরাত

  • সময়: মঙ্গলবার, ২৫ মার্চ, ২০২৫, ১০.২২ এএম
  • ১৪ জন

আজ ২৫ মার্চ, ভয়াল কালরাত। বাঙালির জীবনে ১৯৭১ সালের এইদিন শেষে এক বিভীষিকাময় ভয়াল কালরাত নেমে এসেছিল। বাঙালি জাতির কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার ঘৃণ্য লক্ষ্যে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এদিন রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে খান খান করে গর্জে ওঠে মেশিনগান। একটি নয়, দুটি নয় অসংখ্য। দেখতে দেখতে ঢাকার আকাশ লাল হয়ে ওঠে আগুনের লেলিহান শিখায়। আগুন জ্বলছে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে। আগুন জ্বলছে পিলখানায়। আগুন জ্বলছে বস্তিতে বস্তিতে। আগুন জ্বলছে নয়াবাজারে, বংশালে। হাজার হাজার নারী-পুরুষ, শিশুর আর্তচিৎকারে ভরে ওঠে ঢাকার আকাশ-বাতাস। শুধু মেশিনগান নয়, আরো কত স্বয়ংক্রিয় ভারী অস্ত্রের গোলাগুলির একটানা শব্দে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে রাজধানীর রাত।

একাত্তরের ২৫ মার্চের রাত। বাঙালি জাতির জীবনের সবচেয়ে বিভীষিকাময় হয়ে ওঠে। দানবীয় নৃশংসতায় এই রাতে বর্বর পাকিস্তানি সৈন্যরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বাঙালিদের ওপর। অথচ বাঙালিরা আশা করেছিল এই দিন কিছু একটা সমঝোতা হবে।

২৫ মার্চের এই রাত ইতিহাসে এক বর্বর গণহত্যার সাক্ষী হয়ে আছে। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের এই অভিযানে ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ঘুমন্ত নিরীহ বাঙালিদের ওপর। উদ্দেশ্য বাঙালির মুক্তির সংগ্রামকে স্তব্ধ করে দেওয়া।

রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘জাতীয় গণহত্যা দিবস’ পালনে গ্রহণ করা হয়েছে বিস্তারিত কর্মসূচি। দিবসটিতে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাণী দিয়েছেন।

বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা মুছে দেওয়ার চেষ্টায় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরু করেছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। তারপর নয় মাসের সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এসেছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। বাঙালিকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী যে সশস্ত্র অভিযান পরিচালনা করে, তার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন সার্চলাইট’।

এই অভিযানের নির্দেশনামা তৈরি করেন পাকিস্তানের দুই সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা ও মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। নির্দেশনামার লিখিত নথি রাখা হয়নি। গণহত্যার সেই পুরো নির্দেশ মুখে মুখে ফরমেশন কমান্ডার বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানানো হয়।

অনেক পরে, ২০১২ সালে, মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা ‘এ স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওন কান্ট্রি’ শিরোনামে আত্মজীবনী প্রকাশ করেন। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত সেই আত্মজীবনীতে প্রথমবারের মতো ‘অপারেশন সার্চলাইট’ সম্পর্কে কিছু তথ্য প্রকাশিত হয়।

দিবসটি উপলক্ষে বাণীতে ২৫ মার্চ নিহত সব শহীদকে স্মরণ করে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঢাকাসহ সারা দেশে বিশ্বের বর্বরতম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। নারকীয় এই হত্যাযজ্ঞে জাতি আজও শোকাহত।

ড. ইউনূস বলেন, একাত্তরের মার্চের দিনগুলোতে বাংলাদেশ যখন আন্দোলনে উত্তাল, তখন ২৫শে মার্চ সন্ধ্যায় অসহযোগ আন্দোলনের মধ্যেই স্বৈরশাসক ইয়াহিয়া গোপনে ঢাকা ত্যাগ করে। সেদিন মধ্যরাতে পাকিস্তানি সৈন্যরা ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ পরিচালনা করে ঘুমন্ত-নিরস্ত্র মানুষের ওপর ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাযজ্ঞ চালায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানা এবং রাজারবাগসহ সারা দেশে অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হানাদার বাহিনীর অতর্কিত হামলায় শহীদ হন ছাত্র-শিক্ষক, পুলিশ ও সেনা সদস্যসহ হাজারো নিরপরাধ মানুষ। তাদের আত্মদানের পথ ধরেই দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা অর্জন করেছি কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা।

বাণীতে তিনি আরো বলেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী যে বাংলাদেশ আমরা চেয়েছিলাম, সে বাংলাদেশে পতিত স্বৈরাচারের শাসনামলে মানুষের কোনো মৌলিক অধিকার ছিল না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার বীরত্বে জাতি স্বৈরাচারের অত্যাচার-নিপীড়নের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছে। একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে এগিয়ে যেতে চায়। নতুন বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী, শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে- গণহত্যা দিবসে এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

ঢাবির কর্মসূচি

দিবসটি পালন উপলক্ষে আজ সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতি চিরন্তন চত্বরে মোমবাতি প্রজ্বালন, ডকুমেন্টারি প্রদর্শন এবং আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। ভিসি অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা, প্রোভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ এবং কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এম. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী উপস্থিত থাকবেন। এছাড়া রাত সোয়া ৮টায় জগন্নাথ হল প্রাঙ্গণে অবস্থিত গণসমাধিতে মোমবাতি প্রজ্বালন ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হবে। আজ রাত সাড়ে ১০টায় জরুরি স্থাপনা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সব জায়গায় এক মিনিট ‘ব্ল্যাক আউট’ কর্মসূচি পালন করা হবে। এছাড়া আজ বাদ আসর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে দোয়া-মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে।

একনজরে অপারেশন সার্চলাইট

পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ও সামরিক আইন প্রশাসক লে. জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খান বাঙালিদের দমনে সামরিক শক্তি প্রয়োগে রাজি ছিলেন না। ৫ মার্চ তিনি পদত্যাগ করেন। এরপর পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হন বেলুচিস্তানের কসাইখ্যাত জেনারেল টিক্কা খান। ১৬ মার্চ জেনারেল রাও ফরমান আলী ও জেনারেল খাদিম হোসেন রাজাকে নতুন নীলনকশা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়। ১৮ মার্চ সকালে তারা অপারেশন সার্চলাইটের বিস্তারিত পরিকল্পনা করেন।

এই পরিকল্পনায় ছিল- পূর্ব পাকিস্তানের সব গুরুত্বপূর্ণ শহরে একযোগে আক্রমণ চালানো হবে। আক্রমণ হবে রাতে। সিদ্ধান্ত হয় অপারেশনের বিষয়টি যতদূর সম্ভব শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গোপন রাখা হবে। পাকিস্তানের সঙ্গে বহির্বিশ্বের সব গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ (আকাশ, নৌপথসহ) বিচ্ছিন্ন করা হবে।

সব অনুষ্ঠান মার্শাল ল’ কর্তৃপক্ষ পরিচালনা করবে। বেতার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা হবে। গুরুত্বপূর্ণ আওয়ামী লীগ নেতাদের গ্রেপ্তার করা হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসগুলো দুষ্কৃতকারী ও অস্ত্রের জন্য তল্লাশি করা হবে। বিভিন্ন সেনানিবাসে অবস্থিত বাঙালি সৈনিকদের নিরস্ত্র করা হবে। পাঁচ পৃষ্ঠার পরিকল্পনায় ১৬টি অনুচ্ছেদ ছিল। এতে ১৬ ব্যক্তির নাম উল্লেখ ছিল, যাদের গ্রেপ্তার করতে হবে। ১৯ মার্চ জেনারেল টিক্কা খান অপারেশন সার্চলাইট কার্যকর করার চূড়ান্ত অনুমোদন দেন।

২৫ মার্চ সন্ধ্যায় ক্যান্টনমেন্টের সব ফরমেশনকে জানানো হয়, অপারেশন ওই রাত একটার পর কোনো এক সময়ে শুরু হবে। রাত আটটায় ইয়াহিয়া নিঃশব্দে ঢাকা ত্যাগ করেন। ভুট্টো তখনো হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। রাত ১১টায় সেনাবাহিনী শহরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। গুলির শব্দে মাঝরাতে ঘুম ভাঙে ঢাকাবাসীর। ঘুমের মধ্যেই শহীদ হন হাজারো নিরপরাধ মানুষ।

আপনার সামাজিক মাধ্যমে খবরগুলো শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও খবর পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved by BUD News 24-2025
Developed BY www.budnews24.com