অর্থ সংকটে ব্যয় সংকোচন করছে সরকার। আগস্টে পটপরিবর্তনের পর বেশিরভাগ অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে ব্যয় কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। ফলশ্রুতিতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়নও ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে অবস্থান করছে।
সংশোধিত উন্নয়ন কর্মসূচিতে এবার ৪৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। অর্থাৎ চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মোট বরাদ্দের তুলনায় ১৮ শতাংশ কমছে। আগামী ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রস্তাবিত আরএডিপি নিয়ে বর্ধিত সভা আয়োজনের কথা রয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানিয়েছে, গত ৭ জানুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয় আরএডিপির আকার ২ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করে চিঠি দিয়েছে। এর মধ্যে সরকারের অর্থায়ন ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা আর বিদেশি ঋণ ৮১ হাজার কোটি টাকা।
এডিপিতে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ছাড়া মূল বরাদ্দ রয়েছে ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের ১ লাখ ৬৫ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক ঋণ থেকে এক লাখ কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্য ছিল। সংশোধিত এডিপিতে মোট বরাদ্দ দেওয়া হতে পারে ২ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। ফলে বরাদ্দ কাটছাঁট হচ্ছে ৪৯ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের বরাদ্দ দেওয়া হবে ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক ঋণ থেকে ৮১ হাজার কোটি টাকা।
ইতোমধ্যে সংশোধিত এডিপির বরাদ্দ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের এডিপি বাস্তবায়নের গতি কম থাকায় সরকারি তহবিলের চাহিদাও অনেক কমেছে। সাধারণত অন্যান্য অর্থবছরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সরকারি তহবিল থেকে চাহিদা অনেক বেশি থাকে। কিন্তু চলতি অর্থবছরে এডিপিতে যে পরিমাণ সিলিং বেঁধে দেওয়া হয়েছে, চাহিদা তার চেয়ে কম রয়েছে।
গত বছরের ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর বেশকিছু বড় প্রকল্পে উন্নয়ন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া কিছু ঠিকাদার পালিয়ে গেছেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংশোধিত উন্নয়ন বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়নে বরাদ্দ সবচেয়ে কম। অথচ মানবসম্পদ উন্নয়নে বরাদ্দ থাকার কথা ছিল সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশ এই মুহূর্তে কর্মক্ষমতার স্বর্ণযুগে অবস্থান করছে। মোট জনসংখ্যার ৬৫ ভাগই কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। অথচ এ মানবসম্পদ উন্নয়নে সরকারের বিশেষ কোনো নজর নেই।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরের আরএডিপিতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার জন্য মোট বরাদ্দ স্থানীয় সরকার বিভাগের (এলজিডি) তুলনায় প্রায় ৫৫ শতাংশ কম। তারা বলছেন, আসন্ন আরএডিপিতে স্বাস্থ্য এবং প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার জন্য মোট ২৩ হাজার ৪৩২ কোটি টাকার তহবিল প্রস্তাব করা হবে। অন্যদিকে সর্বোচ্চ ৩৬ হাজার ১৯৬ কোটি টাকা বরাদ্দ স্থানীয় সরকার বিভাগে (এলজিডি) যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় অবকাঠামো উন্নয়ন হলেও বছরের পর বছর দেশে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা নেই। ফলে মানুষ উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাচ্ছে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রশাসন তাদের উন্নয়ন বাজেট প্রায় অর্ধেক কমিয়ে ৫ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকায় নামানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এডিপিতে এ খাতের বরাদ্দ ছিল ১১ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা। একই ভাবে প্রস্তাবিত আরএডিপিতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষার জন্য তহবিল বরাদ্দ ১৬ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ১২ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা হচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশন প্রস্তাবিত এই আরএডিপিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের জন্য ১১ হাজার ৩৮৮ কোটি থেকে কমিয়ে ৫ হাজার কোটি টাকা করার প্রস্তাব করেছে।
পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়নে অদক্ষতার’ কারণে আসন্ন সংশোধিত উন্নয়ন বাজেটে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ প্রায় ৫০ শতাংশ কমানোর জন্য তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।
চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়কালে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ তাদের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির মাত্র ৫ দশমিক ১৫ শতাংশ ব্যয় করেছে, যা গড় ব্যয়ের হার ২১ দশমিক ৫২ শতাংশের চেয়ে ১৬ শতাংশ কম।
ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিভাগের প্রকল্প কার্যকরণের হারও প্রথম সাত মাসে খারাপ ছিল। ফলে আসন্ন আরএডিপিতে তাদের বরাদ্দ থেকে কর্তন করা হয়েছে।’
অন্যদিকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি) সময়মতো তাদের প্রকল্প বাস্তবায়নে অনেক সক্ষম, ফলে বরাদ্দ কম কর্তন করা হয়েছে। গ্রামীণ বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য অবকাঠামো নির্মাণের জন্য বিভাগটি কাজ করছে।
এদিকে, বিদ্যুৎ বিভাগের চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য এডিপিতে বরাদ্দ ৩৩ হাজার ৭১৭ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ২১ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ ১৮ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ১২ হাজার ১২৯ কোটি টাকা, রেলপথ মন্ত্রণালয় ১০ হাজার ২২৮ কোটি টাকা, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ১০ হাজার ২১১ কোটি টাকা, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় ৭ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা এবং সেতু বিভাগ ৫ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা আরএডিপিতে পাবে।
প্রস্তাবিত আরএডিপিতে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতের জন্য ৪৮ হাজার ২৫৩ কোটি টাকা বা ২২.৩৪ শতাংশ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য ৩১ হাজার ৮৯৮ কোটি টাকা বা ১৪.৭৭ শতাংশ, শিক্ষা খাতের জন্য ২০ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা বা ৯.৪২ শতাংশ এবং গৃহায়ন ও কমিউনিটি সার্ভিসেস খাতের জন্য ১৯ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা বা ৯.১৬ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।