জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের স্মৃতিকে তাজা রাখতে আজ সারা দেশে ভিডিওচিত্র প্রদর্শনী করবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সেইসঙ্গে খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) সংঘর্ষের ভিডিওচিত্রও প্রদর্শন করা হবে।
বুধবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৩টা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে (টিএসসি) এই ভিডিওচিত্র প্রদর্শনী করা হবে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনায় ছাত্রদলকে দায়ী করছে।
মঙ্গলবার রাতে কুয়েটে সংঘর্ষের প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে এই কর্মসূচির ঘোষণা দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ।
হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ‘আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করছি আমাদের সেই স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে। আমাদের সবসময় সচেতন থাকতে হবে। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর কোনো সন্ত্রাসের ঠিকানা হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই, ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই, যুবলীগের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই, নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই। এই লড়াই একটা বিপ্লবের। জন্ম থেকে মৃত্যুর মাঝামাঝি সময়ে অব্যাহতি থাকবে। আমাদের লড়াই শেষ হয়ে যায়নি।’
সমাবেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্য সচিব আরিফ সোহেল বলেন, ‘জুলাই-আগস্টের মতো আর কোনো নিপীড়ন আমরা মেনে নেব না। ছাত্রলীগের মতো হামলার প্রবণতাকে সমর্থন করা যাবে না। আমাদের ভাই-বোনেরা যেভাবে শহিদ হয়েছেন, তাদের রক্তের দায় আমাদের ওপর রয়েছে।’
আরিফ সোহেল আরও বলেন, ‘আমরা কারও জান-মালের ক্ষতি করার অধিকার কোনো অবস্থাতেই মেনে নেব না। ছাত্রলীগের মতো হামলা করতে চাইলে তাদের বিরুদ্ধে আমরা কঠোরভাবে দাঁড়াব।’
এর আগে, কুয়েটে সাধারণ শিক্ষার্থীদের দু’পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় পক্ষের ৩০ কয়েকজন আহত হন। এই পরিস্থিতির পর ক্যাম্পাসে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
ছাত্রদলের অভিযোগ, লিফলেট বিতরণকালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্রশিবির তাদের ওপর হামলা চালায়। পরে একপর্যায়ে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়।
ছাত্রশিবিরের দাবি, কুয়েটের সংঘর্ষে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। অপরদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা জানান যে ছাত্রদল সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালালে তারা সেখানে উপস্থিত হন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গত কয়েকদিন ধরে কুয়েট শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া গ্রুপে ছাত্রদলের কমিটি গঠন নিয়ে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া চলছিল। সোমবার ছাত্রদল ক্যাম্পাসে লিফলেট বিতরণ করে। মঙ্গলবার সকালে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবিতে একদল শিক্ষার্থী মিছিল বের করে।
পরে উপাচার্যের কার্যালয় ঘেরাও করলে ছাত্রদল নেতাকর্মীদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডা হয়। দুপুর ১২টার দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে মিছিল বের করে।
তারা ‘ছাত্র রাজনীতি ঠিকানা, এই কুয়েটে হবে না’, ‘দাবি মোদের একটাই, রাজনীতি মুক্ত ক্যাম্পাস চাই’, ‘এই ক্যাম্পাসে হবে না, ছাত্র রাজনীতির ঠিকানা’ ইত্যাদি বিভিন্ন স্লোগান দিতে দিতে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র হলগুলো প্রদক্ষিণ করে। পরে কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সামনে পৌঁছালে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা তাদের ভুয়া ভুয়া বলে স্লোগান দেয়। এ সময় দুই গ্রুপের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। একপর্যায়ে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। পরে তা কুয়েট ক্যাম্পাসের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে।
বিকেল ৫টা পর্যন্ত সংঘর্ষ চলে। এতে প্রায় ৩০ জন আহত হন। সংঘর্ষে আহতদের কুয়েটের অ্যাম্বুলেন্সে করে একের পর এক হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেখা গেছে।
কুয়েট সিভিল ২০ ব্যাচের শিক্ষার্থী রাহাতুল ইসলাম বলেন, ‘ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবি নিয়ে ভিসির কাছে গেলে ছাত্রদলের ছেলেরা আমাদের হুমকি দেয়। তারা সিনিয়রদের লাঞ্ছিত করে। আমরা ভিসির কাছে এই বিচার দিয়ে বের হয়ে আসার পর বিনা উসকানিতে আমাদের ওপর হামলা চালায়। আমরা তাদের ধাওয়া দিয়ে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দিয়েছি। পরে আশপাশের এলাকার বিএনপির লোকজন সঙ্গে নিয়ে তারা আবার হামলা চালায়। এতে অসংখ্য ছাত্র আহত হয়েছে।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন খুলনা জেলা কমিটির মুখপাত্র মিরাজুল ইসলাম ইমন বলেন, ‘বিনা উসকানিতে ছাত্রদলের কর্মীরা ছাত্রদের রক্ত ঝরিয়েছে। তারা কুয়েটের সদস্য সচিব জাহিদ ভাইকে রামদা দিয়ে ১০টা কোপ দিয়েছে, জেলার আহ্বায়ক তাসনিম ও সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব রাতুলে পা ইট দিয়ে থেতলে দিয়েছে। অসংখ্য ছাত্র আহত। সব তথ্য পরে দিতে পারবো।’
খুলনা মহানগর ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক ইশতিয়াক আহমেদ ইশতি দাবি করেন, ‘ছাত্রশিবির সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালাতে গেলে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা তাদের বাধা দেয়। পরে তাদের সঙ্গে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়েছে।’
মহানগর ছাত্রশিবিরের সভাপতি আরাফাত হোসাইন মিলন বলেন, ‘কুয়েটের ঘটনার সঙ্গে ছাত্রশিবিরের কোনো সম্পর্ক নেই। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রদল ও বিএনপি নেতাকর্মীরা হামলা চালিয়ে অনেককে আহত করেছে বলে শুনেছি। আমরা হামলার নিন্দা ও জড়িতদের বিচার চাই।’
খানজাহান আলী থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কবির হোসেন বলেন, ‘ঘটনাস্থল থেকে ৫ জন আটক করা হয়েছে। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, পুলিশ ও র্যাব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করে।’
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার নাজমুল হাসান রাজীব বলেন, ‘সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, পুলিশ ও র্যাব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে একযোগে কাজ করছে। অনেক শিক্ষার্থী আহত হয়েছে।’
এ ঘটনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দুই প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। এ পরিস্থিতির মধ্যেই, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কুয়েটের হামলার ভিডিও দেশব্যাপী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রদর্শন করার কর্মসূচি ঘোষণা করলো।