গুলি, রাবার বুলেট, টিয়ার শেল বা কমপক্ষে নির্দয় লাঠিপেটা— বিশেষ করে শেখ হাসিনার শাসনামলের পুলিশ বললেই দেশবাসীর মানসপটে এমন দৃশ্যই ভেসে উঠত। হাসিনার পেটোয়া বাহিনীতে পরিণত হওয়া সেই পুলিশ বাহিনীর সর্বশেষ একটি ঘটনায় কিছুটা হলেও ভিন্ন বার্তা পাচ্ছেন দেশবাসী।
নির্মমতার বিপরীতে মানবিকতা ও বিচক্ষণতার মিশেলে পুলিশও যে মানুষের মনে ইতিবাচক অবস্থান তৈরি করে নিতে পারে, তার নজির সৃষ্টি করলেন কনস্টেবল রিয়াদ হোসেন। আন্দোলন দমনের ক্ষেত্রে লাঠিচার্জ না করেও কীভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অহিংস পন্থায় দায়িত্ব পালন করা যায়, তা দেখালেন এই পুলিশ সদস্য।
রিয়াদ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্টের (পিওএম) পূর্ব বিভাগের ‘এ’ কোম্পানিতে দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি ফেসবুকসহ কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ১৮ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, হাতে লাঠি থাকার পরও কোনোরকম আঘাত কিংবা লাঠিপেটা ছাড়াই সচিবালয় ঘেরাও করতে আসা আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কৌশলী ভূমিকা পালন করছেন রিয়াদ।
তিনি একাই অনেক বিক্ষোভকারীকে হটিয়ে দিচ্ছেন। বারবার লাঠি দিয়ে আঘাত করার ভঙ্গি করলেও কিন্তু কাউকেই লাঠিপেটা করছেন না। কৌশল হিসেবে মাঝেমধ্যে পিচঢালা রাস্তায় আঘাত করছেন আর ধাওয়া করছেন বিক্ষোভকারীদের। একবার দেখা যায়, রাস্তার পাশের ফুটপাতে থাকা বৈদ্যুতিক খুঁটিতে আঘাত করতে।
এ বিষয়ে ডিএমপির পিওএম পূর্ব বিভাগের ডিসি রেজাউল করিম আমার দেশকে জানান, গত ১৩ ফেব্রুয়ারি দুপুরে নরসিংদী টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষার্থীরা সচিবালয় ঘেরাও করতে আসেন। সেখান থেকে সরে যাওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ জানানো হলেও তারা কথা শোনেননি। একপর্যায়ে সচিবালয়ের নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
রেজাউল করিম আরো বলেন, গত ৫ আগস্ট ক্ষমতার পরিবর্তনের পর পুলিশের জন্য অনেক মোটিভেশনাল কাজ করা হচ্ছে। পুলিশ সংস্কারের অংশ হিসেবে কম বলপ্রয়োগে কীভাবে আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তা শেখানো হচ্ছে। এক্ষেত্রে সশরীরে অংশ নিতে হচ্ছে এসপি পদমর্যাদার কর্মকর্তা থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যন্ত।
পুলিশ সদস্য রিয়াদের গ্রামের বাড়ি যশোর সদরের চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের বাধিয়াটোলায়। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার ছোট রিয়াদ আমার দেশের সঙ্গে আলাপকালে জানান, কৃষক বাবা ইসমাইল হোসেন ও গৃহিণী মা রীনা তাকে মানবিক হতে শিখিয়েছেন। একই সঙ্গে সম্প্রতি পুলিশের পক্ষ থেকে কম বলপ্রয়োগে আন্দোলন নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে প্রশিক্ষণ কর্মশালা তার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে খুব কাজে লাগছে।
এদিকে খুব কাছে পেয়েও কাউকে আঘাত না করেই এভাবে আন্দোলনকারীদের হটিয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা এই পুলিশ সদস্যকে নিয়ে প্রশংসায় পঞ্চমুখ নেটিজেনরা। তারা বলছেন, এমনই হওয়া উচিত পুলিশিং। এভাবেই মানুষের মন জয় করা উচিত।
মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি ও পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ড. উমর ফারুক আমার দেশকে বলেন, রিয়াদের কাজ অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। পুলিশ নিয়ে মানুষের মনস্তত্ত্বে পরিবর্তনের জন্য প্রশিক্ষণসহ বিশদ পরিকল্পনা নেওয়া সময়ের দাবি।